মঙ্গলবার ● ৭ এপ্রিল ২০২৬
বাউফলে পিটিয়ে হত্যা: প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, উজ্জল ছিলেন নিরপরাধ
হোম পেজ » পটুয়াখালী » বাউফলে পিটিয়ে হত্যা: প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, উজ্জল ছিলেন নিরপরাধ
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বাউফল (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের একটি নতুন চরে জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতায় নিহত উজ্জল কর্মকার (৪০) ছিলেন সম্পূর্ণ নিরপরাধ- এমন দাবি করেছেন প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে, আর স্বজনরা দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
নিহত উজ্জলের বাড়ি উপজেলার কালাইয়া বন্দর এলাকায়। পেশায় তিনি স্বর্ণশিল্পী ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ হিসেবে পরিচিত উজ্জলের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপরাধের অভিযোগ বা মামলা ছিল না।
চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নটি উপজেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন, চারপাশে তেঁতুলিয়া নদী বেষ্টিত। নৌপথই সেখানে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। ছোট লঞ্চে প্রায় আধা ঘণ্টা সময় লাগে পৌঁছাতে। ওই ইউনিয়নের চরওয়াডেল এলাকার পূর্ব পাশে তেঁতুলিয়া নদীতে সম্প্রতি নতুন একটি চর জেগেছে। সেখানে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে যেতে সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ মিনিট।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দুপুরে কালাইয়া বন্দরের ব্যবসায়ী মো. সিরাজুল ইসলামের ছেলে মো. মিজানুর রহমান (৪৫), উজ্জল কর্মকারসহ পাঁচজন ওই চরে যান। ইঞ্জিনচালিত নৌকার চালক মো. আশরাফ হাওলাদার জানান, উজ্জল সেখানে ঘুরতে গিয়েছিলেন এবং ফেরার সময় তরমুজ কিনে আনার কথা বলেছিলেন। তবে চরে পৌঁছানোর পর মিজানুর ও শামীম নামের আরেক ব্যক্তি তরমুজ চাষি ফিরোজ গাজীর সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে তাকে মারধর করেন। উজ্জল কোনো মারামারি বা কথা-কাটাকাটিতে অংশ নেননি; বরং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
স্থানীয় কৃষক ও প্রত্যক্ষদর্শী মো. আলমগীর হোসেন সাগরকন্যার এ প্রতিবেদককে জানান, ঘটনার সময় চরে কয়েকজন শ্রমিক তরমুজ ক্ষেতে কাজ করছিলেন। বিকেল তিনটার দিকে মিজানুর ও ফিরোজের মধ্যে বিরোধের জেরে মারধরের ঘটনা ঘটে। তবে নিহত উজ্জল ওই সংঘর্ষে জড়িত ছিলেন না।
ফিরোজকে আহত অবস্থায় প্রথমে চরওয়াডেল খানকা এলাকায় নেওয়া হয়, পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হয়ে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
অন্যদিকে, ওই ঘটনার জেরে পরে দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষে ফিরোজের স্বজন ও স্থানীয়দের একটি দল লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে মিজানুর, শামীম ও উজ্জলকে মারধর করে। প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিক মো. রাশেদুলের ভাষ্য, উজ্জল মারামারিতে অংশ না নিয়েও পিটুনিতে গুরুতর আহত হন এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে মারা যান।
নৌকার চালক আশরাফ হাওলাদার জানান, ফিরোজকে মারধরের খবর পেয়ে তার ছোট ভাই জালাল গাজীসহ ১২-১৪ জনের একটি দল এসে হামলা চালায়। বাকি দুজন পালাতে সক্ষম হলেও উজ্জলকে নির্মমভাবে পিটিয়ে আহত করা হয়। তিনি নিজেও ঘটনাটি দেখে অচেতন হয়ে পড়েন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেন, হামলার পর আহতদের ক্ষেতে ফেলে রেখে অভিযুক্তরা বিষয়টি ‘ডাকাতি’ হিসেবে প্রচারের পরিকল্পনা করছিল।
কালাইয়া বন্দরের ব্যবসায়ী ও পরিবেশক সমিতির সভাপতি মো. মাসুম ছিদ্দিকী সাগরকন্যাকে বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে উজ্জলকে চিনি। তিনি ভদ্র ও বিনয়ী মানুষ ছিলেন। জীবনে প্রথম চন্দ্রদ্বীপে ঘুরতে গিয়েছিলেন, কিন্তু ফিরলেন লাশ হয়ে।’ তিনি জানান, উজ্জলের মা, স্ত্রী ও নয় বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।
নিহতের কন্যা আবেগঘন কণ্ঠে বলে, ‘বাবা তরমুজ কিনে আনবেন বলেছিলেন। আমি যেতে নিষেধ করেছিলাম। যারা আমার বাবাকে মেরেছে, তাদের বিচার চাই।’
নিহতের স্বজন ও সাংবাদিক কৃষ্ণ কান্ত কর্মকার বলেন, ‘উজ্জলের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল না। তাকে যেভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তা অত্যন্ত মর্মান্তিক।’ তিনি প্রকৃত খুনিদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই অমৃত কর্মকার বাদী হয়ে ১৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১৫-২০ জনকে আসামি করে বাউফল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, ‘প্রধান আসামিসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি করা হবে না।’
বাংলাদেশ সময়: ১৭:১৮:১১ ● ২৬ বার পঠিত
