রবিবার ● ৮ নভেম্বর ২০২৬
বাউফলে কারখানা নদীর ভাঙনে ছিন্নভিন্ন কাছিপাড়ার দুই ঐতিহ্যবাহী পরিবার
হোম » ফিচার » বাউফলে কারখানা নদীর ভাঙনে ছিন্নভিন্ন কাছিপাড়ার দুই ঐতিহ্যবাহী পরিবার
![]()
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বাউফল (পটুয়াখালী)
একসময় গোয়ালভরা গরু, গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ আর মানুষের পদচারণায় মুখর ছিল পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কাছিপাড়া ইউনিয়নের সিকদার বাড়ি ও আকন বাড়ি। কয়েক প্রজন্ম ধরে সম্পদ, প্রভাব ও ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করা বৃহৎ এই দুই পরিবার এখন কারখানা নদীর ভাঙনে ছিন্নভিন্ন। বসতভিটা, ফসলি জমি ও পারিবারিক সম্পদ হারিয়ে অনেকের ঠাঁই হয়েছে সড়কের পাশে কিংবা অন্যের জমিতে।
শুধু সিকদার ও আকন বাড়ি নয়, ইউনিয়নের বাহেরচর, পশ্চিম কাছিপাড়া, হাজীপুর ও গোপালিয়াসহ কয়েকটি গ্রামের সহস্রাধিক পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। কারও বসতঘর, কারও শেষ সম্বল ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে বাজার, পুকুর, পাকা সড়ক ও তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিনিয়ত নদীর পাড় ভাঙছে, বাড়ছে নিঃস্ব মানুষের সংখ্যা।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে কারখানা নদীর তীরে কাছিপাড়া ইউনিয়নের অবস্থান। আয়তন, জনসংখ্যা, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বাউফলের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নগুলোর একটি এটি। অথচ নদীভাঙনে জনপদটির মানুষের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা।
নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া পরিবারগুলোর একজন নাসরিন বেগম (৩৫)। তিন ছেলেকে নিয়ে তাঁর সংসার। ২০০৭ সালে কাছিপাড়ার সিকদার বাড়ির ইব্রাহিম সিকদারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
নাসরিন সাগরকন্যার এ প্রতিবেদককে বলেন, একসময় তাঁদের বাড়িতে ৫০ থেকে ৬০টি পরিবারের বসবাস ছিল। গোয়ালভরা গরু, ধানভরা গোলা, পাকা দালান, মাছভরা পুকুর ও পাকা ঘাটলা ছিল। আত্মীয়স্বজনের কাছেও বাড়িটির আলাদা পরিচিতি ছিল।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘মাত্র দুই বছর আগেও সিকদার বাড়ির অস্তিত্ব ছিল। এখন স্বামী-সন্তান নিয়ে ফসলি জমিতে ঘর তুলে থাকতে হচ্ছে। কারখানা নদী আমার শ্বশুরবাড়ির সবকিছু গিলে খেয়েছে। একসময় এই বাড়িতে ১০০ থেকে ১৫০ মানুষের বসবাস ছিল। এখন আমরা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছি।’
বাহেরচরের ৭৮ বছর বয়সী নিত্য গোপালের জীবনেও নদীভাঙন কেড়ে নিয়েছে সবকিছু। সড়কের পাশে টিনের ছাউনির ছোট্ট দোচালা ঘরে তাঁর বসবাস। পাশে রয়েছে একটি ছোট চায়ের দোকান। দোকানের আয় ও তিন মেয়ের সহযোগিতায় চলে তাঁর ও স্ত্রীর সংসার।
নিত্য গোপালের কোনো ছেলে নেই। তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বসতভিটা ও জমিজমা হারিয়ে এখন তাঁর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা মৃত্যুর পর শেষকৃত্য নিয়ে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বাবার কাছ থেকে ছয় একর জমি পেয়েছিলাম। নদীভাঙনে সব গেছে। আমার জমি ভেঙে যে চর জেগেছে, সেই জায়গা প্রভাবশালীদের দখলে। মরার পর শ্মশানে যাওয়ার জায়গাটুকুও নেই।’
নিত্য গোপালের মতো অনুকূল, বাসুদেবসহ আরও অনেক পরিবার জমি ও বসতভিটা হারিয়ে অন্যের জমিতে কিংবা সড়কের পাশে আশ্রয় নিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, নদীতে বিলীন হওয়া জমির বিপরীতে নতুন করে জেগে ওঠা চরে নিজেদের জমির অধিকার ফিরে পাননি তাঁরা।
স্থানীয়দের দাবি, বাহেরচর থেকে গোপালিয়াবাঘা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কারখানা নদীর ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এতে চররঘুনদ্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হিস্যাজাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গোপালিয়াবাঘা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষক জাকির সিকদার, এফ এম মামুন ও সুনীল দাস জানান, নদীভাঙনের কারণে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। কোনো কোনো বিদ্যালয়ের কাছাকাছি চলে এসেছে নদী। আগে যে নদী ছিল প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে, এখন তা বিদ্যালয় থেকে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ মিটার দূরে। দ্রুত তীর রক্ষার ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয়গুলো নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হিস্যাজাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী বালাল সিকদার (৫৪) বলেন, ‘এই বিদ্যালয় থেকেই আমি পড়াশোনা করেছি। ছোটবেলার স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠানটি চোখের সামনে হারিয়ে যাবে, এটা মেনে নেওয়া কঠিন। নদীর তীর রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’
স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভাঙন অব্যাহত থাকলে বাহেরচর বাজারসহ আশপাশের বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও রক্ষা করা কঠিন হবে।
নদীভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভিন্ন সময়ে জিওব্যাগ ফেললেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
কাছিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. ইয়াকুব সাগরকন্যাকে বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ড জিওব্যাগ ফেলে। কিন্তু ভাটার সময় সেগুলোর অনেক কিছুই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এভাবে ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ও বসতভিটা হারাচ্ছে মানুষ। আমরা দ্রুত ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা চাই।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বাহেরচর এলাকায় চররঘুনদ্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে ১০৫ মিটার অংশে জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৫৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। তবে গোপালিয়াবাঘা অংশে এখন পর্যন্ত কোনো কাজ বাস্তবায়ন করা হয়নি।
পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এমরান হোসেন বলেন, ‘কারখানা নদীসহ পায়রা নদীর ভাঙন রোধে একটি সমীক্ষার কাজ চলমান রয়েছে। সমীক্ষা প্রতিবেদন পাওয়ার পর স্থায়ী তীর প্রতিরক্ষা কাজ বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাঠানো হবে।’
বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সালেহ বলেন, ‘নদীভাঙনের তীব্রতায় কাছিপাড়া ও কনকদিয়া ইউনিয়নের মানচিত্র ছোট হয়ে আসছে। মাসিক উন্নয়ন সভায় কাছিপাড়া ও কনকদিয়ার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, সদস্যসহ জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি তুলে ধরে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। সরেজমিন পরিদর্শন করে ভাঙনের ভয়াবহতা দেখে জরুরি তীর রক্ষার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
বাংলাদেশ সময়: ১৬:৩৫:৪৮ ● ২১ বার পঠিত
