শুক্রবার ● ৬ নভেম্বর ২০২৬
সাগরে নিখোঁজ জেলেদের সরকারি তালিকা নেই, স্বীকৃতিহীন পরিবারে বাড়ছে সংকট
হোম » জেলে-মৎস্য » সাগরে নিখোঁজ জেলেদের সরকারি তালিকা নেই, স্বীকৃতিহীন পরিবারে বাড়ছে সংকট
![]()
নাসির উদ্দিন বিপ্লব
কুয়াকাটা-মহিপুরে সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ জেলেদের বছরের পর বছরেও মিলছে না আইনি স্বীকৃতি, বিপাকে পরিবারগুলো। তাঁদের পূর্ণাঙ্গ সরকারি তালিকা না থাকায় নানা জটিলতায় পড়ছেন স্বজনেরা। একদিকে আটকে যাচ্ছে সম্পত্তির ওয়ারিশানা ও বণ্টন, অন্যদিকে মিলছে না সরকারি সহায়তা। এতে আর্থিক সংকটের পাশাপাশি অনিশ্চয়তায় কাটছে এসব পরিবারের জীবন।
পটুয়াখালীর মহিপুর ইউনিয়নের নিজামপুর গ্রামের জেলে রিয়াজ হাওলাদার প্রায় ১০ বছর আগে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়ের কবলে ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ হন। স্ত্রী, মা ও তিন সন্তানকে রেখে যাওয়া রিয়াজের নিখোঁজ কিংবা মৃত্যুর কোনো সনদ আজও পায়নি তাঁর পরিবার। মহিপুর ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা সরকারি কোনো দপ্তর থেকেও মেলেনি নিখোঁজের স্বীকৃতি। ফলে সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা।
রিয়াজের স্ত্রী পারভীন বলেন, ‘২০১৬ সালে সাগরে ট্রলার ডুবে আমার স্বামী নিখোঁজ হয়। সে দুনিয়ায় নাই। ইউনিয়ন পরিষদ, ইউএনওর কাছেও গিয়েছি। কোনো জায়গা থেকেই মৃত্যুর সনদ পাই নাই। দেয় না কোনো অনুদান।’
রিয়াজের মা রিনা বেগম বলেন, ‘আমার পোলাডা আইজ দুনিয়ায় নাই। হ্যারও কোনো স্বীকৃতি কেউ দেলে না। আর সরকারি কোনো সাহায্যও আমাগো কপালে নাই।’
একই গ্রামের জেলে রিপন আক্ষেপ করে বলেন, সাগরে নিখোঁজ জেলে রিয়াজের মতো ঘটনায় উপকূলে কত পরিবার প্রতিদিন কাঁদছে, তার খবর কেউ রাখে না।
জানা গেছে, নিখোঁজ জেলেদের সরকারি স্বীকৃতি না থাকায় ওয়ারিশ সনদ পেতেও জটিলতায় পড়ছেন স্বজনেরা। আটকে যাচ্ছে সম্পত্তির বণ্টন ও বেচাকেনা। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে মহিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফজলু গাজী বলেন, সাগরে কোনো জেলে নিখোঁজ হলে তাঁর মৃত্যুসনদ দেওয়ার এখতিয়ার ইউনিয়ন পরিষদের নেই। লাশ উদ্ধার না হলে মৃত্যু নিশ্চিত বলে জানা গেলেও কোনোভাবেই মৃত্যুসনদ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে জেলেদের বিষয়টি সরকার ভিন্নভাবে বিবেচনা করতে পারে।
অন্যদিকে গত এক থেকে দুই দশকে সমুদ্রে নিখোঁজ হওয়া জেলেদের কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই মৎস্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন কিংবা পরিসংখ্যান অফিসে। এমনকি মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য বন্দরে পরিচালিত পৃথক জেলে সংগঠনগুলোর কাছেও নেই তাঁদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। ফলে প্রকৃতপক্ষে কতজন জেলে সমুদ্রে নিখোঁজ হয়েছেন এবং তাঁদের কতটি পরিবার আইনি স্বীকৃতি ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাবও মেলেনি।
এ অবস্থায় নিখোঁজ জেলেদের সরকারি তালিকা প্রণয়ন, তাঁদের আইনি স্বীকৃতি এবং স্বজনদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
পরিবারগুলোর দাবির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার কথা জানিয়েছেন কলাপাড়ার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী।
সমুদ্রে নিখোঁজ জেলেদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন ও তাঁদের পরিবারকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হলে সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি সহায়তা পাওয়ার পথও সুগম হবে। এতে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগ কমবে বলে আশা করছেন উপকূলের নিখোঁজ জেলেদের স্বজনেরা।
বাংলাদেশ সময়: ১৮:৪৮:৫৬ ● ৩৬ বার পঠিত
