শুক্রবার ● ৬ নভেম্বর ২০২৬
বিমানবন্দরে পাখি নিয়ন্ত্রণে অচল ব্যবস্থা, বাড়ছে বার্ড স্ট্রাইকের ঝুঁকি
হোম » জাতীয় » বিমানবন্দরে পাখি নিয়ন্ত্রণে অচল ব্যবস্থা, বাড়ছে বার্ড স্ট্রাইকের ঝুঁকি
সাগরকন্যা প্রতিবেদক
দেশের আটটি বিমানবন্দরেই পাখির কারণে উড়োজাহাজ চলাচলে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ছে। অথচ পাখি নিয়ন্ত্রণে নেই পর্যাপ্ত সরঞ্জাম, সচল বন্দুক ও প্রশিক্ষিত জনবল। দেশের প্রধান বিমানবন্দরের বার্ড কন্ট্রোল সিস্টেম দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। অভ্যন্তরীণ পাঁচটি বিমানবন্দরে নেই বার্ড শুটার। কোথাও পুরোনো বন্দুক দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে, কোথাও তাও অকেজো। ফলে উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় পাখির সঙ্গে উড়োজাহাজের সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ, ঘটছে ফ্লাইট বিলম্ব ও জরুরি অবতরণের মতো ঘটনা।
বিশেষ করে শীত মৌসুমে বিমানবন্দর ও আশপাশে পাখির আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকি আরও বাড়ে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। তবে দীর্ঘদিনেও বিমানবন্দরগুলোতে কার্যকর পাখি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বেবিচক সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বার্ড কন্ট্রোল সিস্টেম দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। অভ্যন্তরীণ পাঁচটি বিমানবন্দরের কোনোটিতেই বার্ড শুটার নেই। বরিশাল ও যশোর বিমানবন্দরে বন্দুক সচল থাকলেও সৈয়দপুর ও কক্সবাজারে সেগুলো অকেজো। রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে পাখি নিয়ন্ত্রণে কোনো সরঞ্জামই নেই। যশোর বিমানবন্দরে ব্যবহার করা হচ্ছে পুরোনো বন্দুক।
গত তিন বছরে বিভিন্ন বিমানবন্দরে পাখির আঘাতে দেশি-বিদেশি একাধিক উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে লন্ডনগামী বিমানের অত্যাধুনিক ড্রিমলাইনারও রয়েছে। রানওয়েতে পাখি তাড়ানো ও ঝুঁকি পর্যবেক্ষণে কার্যকর উদ্যোগের অভাবেই বারবার এমন ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অস্ত্রের সংকট কাটাতে সম্প্রতি বিমানবন্দর এলাকায় পাখি ও বন্যপ্রাণী নিয়ন্ত্রণের জন্য অস্ত্র কেনার অনুমতি চেয়ে জেলা প্রশাসক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে বেবিচক। এতে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জন্য ১০টি বন্দুক কেনার কথা বলা হয়েছে। রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরেও পাখি ও বন্যপ্রাণী নিয়ন্ত্রণে অস্ত্রের সংকট রয়েছে।
চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও পাখি ও বন্যপ্রাণীর উপদ্রব বাড়ছে। রানওয়ের আশপাশে বনজঙ্গল, পুকুর ও ডোবার পাশাপাশি হোটেল, কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগর থাকায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও বন্যপ্রাণীর আনাগোনা রয়েছে। এতে উড়োজাহাজের সঙ্গে পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। কোনো কোনো বিমানবন্দরে কুকুর ও শিয়ালের উপদ্রব থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, বিশ্বের বিভিন্ন বিমানবন্দরে বার্ড স্ট্রাইক ঠেকাতে অ্যাভিয়ান রাডার, ইনফ্রারেড ও ইলেকট্রো-অপটিক্যাল সেন্সর, লেজার, শব্দভিত্তিক পাখি তাড়ানোর যন্ত্র এবং স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে বিমানবন্দরের আশপাশে পাখির অবস্থান, উচ্চতা ও গতিপথ শনাক্ত করে আগাম সতর্কতা নেওয়া যায়। পাশাপাশি লেজার আলো ও বিশেষ শব্দ ব্যবহার করে পাখি সরানোর ব্যবস্থা রয়েছে। পাখি আকৃষ্ট হয় এমন খাবার, পানির উৎস ও আবাসস্থল নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বেবিচকের পরিকল্পনায় প্রতিবছর আধুনিক পাখি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার জন্য বাজেট বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে তার কার্যকর প্রয়োগ নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। বরাদ্দের অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে একই ধরনের ঝুঁকি রয়ে গেছে।
এদিকে গবেষণায় বাংলাদেশে বার্ড স্ট্রাইকের ঝুঁকি অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি বলে উঠে এসেছে। অন্যান্য দেশে এ ঝুঁকির হার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) নির্দেশনা অনুযায়ী, বিমানবন্দরের রানওয়ে এলাকায় পাখির ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আধুনিক শব্দভিত্তিক বার্ড স্কেয়ারার ও পর্যাপ্ত শটগানসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
অথচ দীর্ঘদিন ধরে বাজেট বরাদ্দের অজুহাতে নতুন বন্দুক ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। ফলে উড়োজাহাজের ইঞ্জিনে পাখি ঢুকে ক্ষতি, ফ্লাইট বিলম্ব এমনকি জরুরি অবতরণের ঘটনাও ঘটছে। এসব ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। শাহ আমানত বিমানবন্দরেও পাখির সঙ্গে উড়োজাহাজের সংঘর্ষ নিয়মিত ঘটছে।
এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান জানান, বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও জনবলের ঘাটতি রয়েছে। অস্ত্রের লাইসেন্স ব্যক্তির নামে দেওয়ার নিয়ম থাকায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে অস্ত্র কেনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বাংলাদেশ সময়: ১০:৫১:৩৩ ● ৯ বার পঠিত
