সোমবার ● ১৭ আগস্ট ২০২৬
মনপুরায় ১,১৭০ কোটি টাকার বেড়িবাঁধে নির্মাণ শেষের আগেই ধস
হোম » লিড নিউজ » মনপুরায় ১,১৭০ কোটি টাকার বেড়িবাঁধে নির্মাণ শেষের আগেই ধস![]()
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, ভোলা
ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরাকে নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষায় ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে ৫০ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ। তবে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই বাঁধের বিভিন্ন অংশে ধস ও গর্ত দেখা দিয়েছে। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে নতুন করে কয়েকটি স্থানে বাঁধের মাটি ও বালু সরে যাওয়ায় প্রকল্পের কাজের মান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকটি সাব-ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করাচ্ছে। ফলে নির্মাণকাজের মান যথাযথ হচ্ছে না। এ ছাড়া মেঘনা নদী থেকে উত্তোলন করা নিম্নমানের বালু বাঁধ নির্মাণে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ‘ভোলার মুজিবনগর ও মনপুরা উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও তীর সংরক্ষণ’ প্রকল্পটি নেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় ৫০ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও পুনর্বাসনে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে কাজ শুরু হলেও বর্ষার কারণে একপর্যায়ে কাজ বন্ধ থাকে। পরে আবার কাজ শুরু হয়। ২০২৭ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করে হস্তান্তরের কথা রয়েছে।
প্রকল্পের কাজের জন্য ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- এনবিই, ওটিবিএল, জিসিএল, এলএকে এসএসএ, পিডিএল ও ওয়েস্টার্ন। এর মধ্যে এনবিই ও ওটিবিএল যৌথভাবে ‘ফারিসা’ নামে কাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি কাজ না করে সাব-ঠিকাদারের মাধ্যমে নির্মাণকাজ পরিচালনা করছে।
স্থানীয়রা জানান, গত দেড় মাসে মনপুরার বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণাধীন বাঁধে একাধিকবার ধস দেখা দিয়েছে। ধসের পর সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করতেও দেখা গেছে।
সর্বশেষ গত মঙ্গল ও বুধবার টানা বৃষ্টির পর হাজিরহাট ইউনিয়নের ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিমাংশে নির্মিত বাঁধে ধস দেখা দেয়। সরেজমিনে মনপুরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম পাশ, হাজিরহাট ইউনিয়নের ২, ৩ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ড এবং দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের সূর্যমুখী এলাকায় বাঁধের বিভিন্ন অংশে ধস ও মাটি সরে যাওয়ার চিত্র দেখা গেছে। কোথাও কোথাও বালু সরে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ধসে পড়া মাটি ও বালু পাশের আমনখেতে পড়ে ফসলেরও ক্ষতি হয়েছে।
হাজিরহাটের সোনারচর এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বাপ্পীসহ স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, মেঘনা নদী থেকে উত্তোলন করা নিম্নমানের বালু বাঁধ নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ কারণে বৃষ্টির পানি পড়লেই বাঁধের মাটি ও বালু সরে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শাকিল কাজী, শুভ্র ও জিসান বলেন, বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে গত বছর ছাত্রদল নেতা রাশেদ নিহত হন। একই বছর মনপুরা ইউনিয়নের রামনেওয়াজ এলাকায় নির্মাণাধীন বাঁধের গর্তে পড়ে ১০ বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়। তাঁদের দাবি, এত বড় প্রকল্পে কাজের মান নিশ্চিত করতে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফারিসার দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মো. তুহিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, পাউবোর প্রকৌশলীদের উপস্থিতিতেই নিয়ম মেনে বাঁধের কাজ করা হচ্ছে। বৃষ্টিতে যেসব স্থানে ধস বা গর্ত হয়েছে, সেগুলো খননযন্ত্র দিয়ে ঠিক করা হচ্ছে।
পাউবো ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা বলেন, বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ এখনও শেষ হয়নি। অতিবৃষ্টির কারণে কয়েকটি স্থানে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই সংস্কারকাজ শুরু হবে।
মেঘনা থেকে বালু উত্তোলন নিয়েও প্রশ্ন
বেড়িবাঁধ নির্মাণকে ঘিরে মেঘনা নদী থেকে বালু উত্তোলন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, মনপুরাকে ঘিরে থাকা মেঘনায় একাধিক ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। সেই বালু বাঁধ নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তীরসংলগ্ন এলাকা থেকে বালু উত্তোলনের কারণে নদীভাঙনের ঝুঁকিও বাড়ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
গত বুধবার (১২ আগস্ট) কোস্ট গার্ড অভিযান চালিয়ে দুটি ড্রেজারসহ পাঁচজনকে আটক করার পর ওই এলাকায় বালু উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। তবে স্থানীয় নাহিদ, ফিরোজ, সামিম তালুকদার ও শুভ্রের অভিযোগ, সুযোগ পেলে আবারও বালু উত্তোলন শুরু হবে। তাঁদের দাবি, বালু উত্তোলনের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
তবে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা বলেন, মেঘনার তীর থেকে এক কিলোমিটার দূরে বালু উত্তোলনের অনুমতি সরকার ও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া আছে। কেউ নির্দেশ অমান্য করে বালু তুললে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এমদাদুল ইসলাম বলেন, উপকূলের কাছ থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশ্ন এখন একটাই
মনপুরাকে নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষায় যখন হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে, তখন নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ধস স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাঁদের প্রশ্ন- এত বড় প্রকল্পে নির্মাণসামগ্রীর মান, কাজের পদ্ধতি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়মিত ও যথাযথভাবে তদারকি করা হচ্ছে কি না।
বাংলাদেশ সময়: ১২:২২:৫২ ● ২৭ বার পঠিত
