সোমবার ● ১৭ আগস্ট ২০২৬
বরগুনায় সাড়ে তিন শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী বিবিচিনি শাহী মসজিদ
হোম » ফিচার » বরগুনায় সাড়ে তিন শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী বিবিচিনি শাহী মসজিদ
![]()
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বরগুনা
বরগুনার বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি ইউনিয়নে সাড়ে তিন শত বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক বিবিচিনি শাহী মসজিদ আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মসজিদটির চারপাশে সবুজের সমারোহ। এর মাঝখানে উঁচু একটি টিলার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা লাল ইটের প্রাচীন স্থাপনাটি দূর থেকেই নজরে পড়ে। সময়ের স্রোত পেরিয়ে পুরোনো ইতিহাসের এক দৃশ্য যেন আজও দৃশ্যমান হয়ে আছে এখানে।
স্থানীয় ইতিহাস ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোগল আমলে নির্মিত এই মসজিদের বয়স প্রায় সাড়ে তিন শত বছর। দীর্ঘ সময় ধরে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে টিকে থাকা স্থাপনাটি এখন বরগুনার অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন।
বেতাগী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে বিবিচিনি ইউনিয়নে মসজিদটির অবস্থান। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু একটি টিলার ওপর নির্মিত মসজিদটি দূর থেকেই দৃষ্টিগোচর হয়।
স্থানীয় ইতিহাসে বলা হয়, ১৬৫৯ সালে পারস্য থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে শাহ নেয়ামত উল্লাহ (রহ.) এ অঞ্চলে আসেন। তিনি মোগল আমলের বাংলার সুবাদার শাহ সুজার ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলেও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে। কথিত আছে, শাহ সুজার অনুরোধে শাহ নেয়ামত উল্লাহ (রহ.) বেতাগীর বিবিচিনি গ্রামে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। তাঁর দুই কন্যা চিনিবিবি ও ইসাবিবির নামের সঙ্গে বিবিচিনি নামটির সম্পর্ক রয়েছে- এমন লোককথাও প্রচলিত রয়েছে।
তবে এসব তথ্যের কিছু অংশ স্থানীয় ইতিহাস ও লোকমুখে প্রচলিত। ফলে ঐতিহাসিক তথ্য, সরকারি নথি ও লোককথাকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিবিচিনি শাহী মসজিদকে ঘিরে প্রচলিত ইতিহাসের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
লাল ইটের তৈরি মসজিদটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রায় ৩৩ ফুট। এর দেয়াল প্রায় ৬ ফুট পুরু। মসজিদের ওপর রয়েছে একটি বড় গম্বুজ। মোটা দেয়াল, গম্বুজ ও নির্মাণশৈলীতে মোগল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।
মসজিদের পশ্চিম পাশে রয়েছে তিনটি কবর। স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এগুলো শাহ নেয়ামত উল্লাহ (রহ.) এবং তাঁর দুই কন্যা চিনিবিবি ও ইসাবিবির কবর। তবে কবরগুলোর পরিচয়ও স্থানীয় বিশ্বাস ও প্রচলিত ইতিহাসের অংশ হিসেবে বিবেচিত।
প্রাচীন এই স্থাপনাটিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে রয়েছে নানা গল্প, কৌতূহল ও বিশ্বাস। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রচলিত এসব গল্পের মধ্য দিয়েই বিবিচিনি শাহী মসজিদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য স্থানীয় মানুষের কাছে এখনও জীবন্ত হয়ে আছে।
সময়ের সঙ্গে মসজিদের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের উদ্যোগ হিসেবে ১৯৮৫ সালে বেতাগী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সংস্কার করা হয়। পরে ১৯৯২ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে এর সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে সরকারি তথ্য থেকে জানা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা সেকান্দার আলী সাগরকন্যার এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘মসজিদটি শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসেন। কেউ নামাজ পড়তে আসেন, আবার কেউ কয়েক শত বছরের পুরোনো স্থাপত্য দেখতে আসেন।’
বিবিচিনি শাহী মসজিদকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনাও রয়েছে। মসজিদের প্রাচীন স্থাপত্য, অবস্থান ও আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। যথাযথ সংরক্ষণ ও পর্যটনবান্ধব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি স্থানীয় পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণে পরিণত হতে পারে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটির যথাযথ সংরক্ষণের পাশাপাশি যাতায়াতব্যবস্থার উন্নয়ন ও পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। স্থানীয়দের দাবি, বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম মনি ঐতিহাসিক শাহী মসজিদে যাতায়াতের সড়কটি সংস্কারে উদ্যোগ নেবেন। তাদের প্রত্যাশা, দর্শনার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে সড়কটি দ্রুত সংস্কার করা হবে।
বাংলাদেশ সময়: ১২:১০:৩৫ ● ৩৬ বার পঠিত
