শুক্রবার ● ২১ আগস্ট ২০২৬
প্রাণীর প্রতিও দয়া- ইসলামের শিক্ষা
হোম » ইসলামী জীবন » প্রাণীর প্রতিও দয়া- ইসলামের শিক্ষা![]()
মুফতি মোঃ বেলাল হোসাইন
ইমাম ও খতিব, আলীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, কুয়াকাটা
প্রাণী শুধু মানুষের উপকারের জন্য সৃষ্টি নয়; তারাও আল্লাহর সৃষ্টি এবং নিজেদের স্বাভাবিক জীবনধারায় তারা আল্লাহর মহিমা প্রকাশ করে। ইসলাম তাই মানুষের প্রতি যেমন দয়া ও সহমর্মিতার শিক্ষা দিয়েছে, তেমনি পশুপাখির প্রতিও দয়া, যত্ন ও দায়িত্বশীল আচরণের নির্দেশ দিয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল কোনো প্রাণী এবং নিজ ডানায় উড়ে এমন কোনো পাখি নেই, যারা তোমাদের মতো একেকটি জাতি নয়।’ (সুরা আল-আনআম, ৬:৩৮)
এই আয়াত প্রাণিজগতের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার মতো একটি শিক্ষা দেয়। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীরই নিজস্ব জীবনব্যবস্থা আছে। তারা আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর জ্ঞান ও কুদরতের নিদর্শন। তাই তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
প্রাণী আল্লাহর নিয়ামত
মানুষের জীবনযাত্রায় প্রাণীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আর তিনি তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন; তাতে তোমাদের জন্য উষ্ণতার উপকরণ এবং বহু উপকার রয়েছে। আর তা থেকে তোমরা আহার কর।’ (সুরা আন-নাহল, ১৬:৫)
এর পরের আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তাতে তোমাদের জন্য সৌন্দর্য রয়েছে, যখন তোমরা সন্ধ্যায় তাদের ফিরিয়ে আন এবং সকালে চারণভূমিতে ছেড়ে দাও।’ (সুরা আন-নাহল, ১৬:৬)
অর্থাৎ প্রাণীরা মানুষের জীবনে খাদ্য, পোশাক, পরিবহনসহ নানা উপকারের মাধ্যম। কিন্তু উপকার নেওয়ার অর্থ তাদের ওপর নিষ্ঠুর হওয়ার অনুমতি পাওয়া নয়। বরং আল্লাহর দেওয়া এই নিয়ামতের যথাযথ ব্যবহার ও প্রাণীর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করাই ইসলামের শিক্ষা।
প্রাণীর প্রতি দয়া করলে সওয়াব
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রাণীর প্রতি দয়ার ব্যাপারে সাহাবিদের শিক্ষা দিয়েছেন। এক হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করালে আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীর সেবায় সওয়াব রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, ২৩৬৩; সহিহ মুসলিম, ২২৪৪)
এই হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। মানুষের চোখে ছোট বা মূল্যহীন মনে হওয়া একটি প্রাণীর তৃষ্ণা নিবারণ করাও আল্লাহর কাছে নেক আমল হতে পারে।
অন্যদিকে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার পরিণতিও হাদিসে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন, এক নারী একটি বিড়ালকে আটকে রেখে না খাইয়ে ও না পান করিয়ে মারা ফেলেছিল। এ কারণে সে শাস্তির সম্মুখীন হয়। (সহিহ বুখারি, ৩৩১৮; সহিহ মুসলিম, ২২৪২)
অকারণে প্রাণী হত্যা নয়
ইসলাম প্রাণী হত্যাকে সব অবস্থায় নিষিদ্ধ করেনি। খাদ্য, মানুষের নিরাপত্তা বা বৈধ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে প্রাণী জবাই ও শিকার বৈধ। তবে নিছক বিনোদন, খেলাচ্ছলে কিংবা অকারণে প্রাণী হত্যা করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো প্রাণীকে লক্ষ্যবস্তু বানিও না।’ (সহিহ মুসলিম, ১৯৫৭)
অর্থাৎ প্রাণীকে শুধু নিশানা অনুশীলন বা বিনোদনের বস্তু বানানো যাবে না। শিকারেরও নৈতিক সীমা রয়েছে।
প্রাণীর ওপর বোঝা চাপানো ও নির্যাতন
ইসলাম প্রাণীর সঙ্গে ব্যবহারেও ভারসাম্যের শিক্ষা দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এই নির্বাক প্রাণীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। সুস্থ অবস্থায় তাদের ওপর আরোহণ করো এবং সুস্থ অবস্থায় তাদের ছেড়ে দাও।’ (সুনানে আবি দাউদ, ২৫৪৮)
এর মাধ্যমে বোঝা যায়, মানুষের প্রয়োজনে প্রাণী ব্যবহার করা গেলেও তাদের ওপর অযথা কষ্ট চাপানো যাবে না। অতিরিক্ত বোঝা চাপানো, ক্ষুধার্ত বা অসুস্থ অবস্থায় কাজে লাগানো কিংবা অকারণে প্রহার করা ইসলামের দয়ার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পাখির বাসা নষ্ট করাও অনুচিত
প্রাণীর প্রতি ইসলামের দয়ার শিক্ষা শুধু গৃহপালিত প্রাণীর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। পাখির ক্ষেত্রেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
একবার সাহাবিরা একটি পাখির ছানা নিয়ে নেওয়ার পর মা পাখিটি ছানাটির খোঁজে অস্থির হয়ে উড়তে থাকে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কে এই পাখিটিকে তার ছানা নিয়ে কষ্ট দিয়েছে? তার ছানাটি তাকে ফিরিয়ে দাও।’ (সুনানে আবি দাউদ, ২৬৭৫)
এ ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়- প্রাণীরও সন্তান, অনুভূতি ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে। মানুষের কৌতূহল বা আনন্দের জন্য তাদের স্বাভাবিক জীবন নষ্ট করা উচিত নয়।
আমাদের করণীয়
ইসলামের এই শিক্ষা শুধু বইয়ে পড়ার বিষয় নয়; দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রয়োগ করা যায়। রাস্তায় তৃষ্ণার্ত প্রাণী দেখলে নিরাপদভাবে পানি দেওয়া, পাখির জন্য পানি ও খাবারের ব্যবস্থা করা, পোষা প্রাণীকে নিয়মিত খাবার দেওয়া, অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং কোনো প্রাণীকে অকারণে কষ্ট না দেওয়া- এসবই দয়ার কাজ।
একই সঙ্গে শিশুদেরও ছোটবেলা থেকে প্রাণীর প্রতি কোমল আচরণ শেখানো প্রয়োজন। কোনো প্রাণীকে পাথর ছোড়া, লাথি দেওয়া, লেজ বা ডানা টেনে ধরা কিংবা ভয় দেখিয়ে আনন্দ নেওয়া নিছক দুষ্টুমি নয়; এটি প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ।
দয়া শুধু মানুষের জন্য নয়
ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই- দয়া ও রহমতকে শুধু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। আল্লাহর সৃষ্ট প্রতিটি জীবের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা দয়া করে, পরম দয়ালু আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন।’ (সুনানে তিরমিজি, ১৯২৪)
তাই প্রাণীর প্রতি আমাদের সামান্য দয়া হয়তো আমাদের কাছে তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু তা আল্লাহর কাছে মূল্যবান হতে পারে। আবার মানুষের আনন্দের জন্য কোনো অসহায় প্রাণীকে কষ্ট দেওয়াও আল্লাহর কাছে জবাবদিহির কারণ হতে পারে।
প্রাণীর প্রতি দয়া তাই শুধু মানবিকতা নয়- এটি একজন মুমিনের ঈমানি দায়িত্ববোধেরও অংশ।
বাংলাদেশ সময়: ৬:০৯:০৮ ● ২৪ বার পঠিত
