শুক্রবার ● ২১ আগস্ট ২০২৬
আল্লাহর পথে দানের ফজিলত ও বরকত
হোম » ইসলামী জীবন » আল্লাহর পথে দানের ফজিলত ও বরকত![]()
সাগরকন্যা ইসলামী ডেস্ক
মানুষের সম্পদ আল্লাহর দেওয়া আমানত। এই সম্পদ থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে অভাবী, অসহায় ও কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। কোরআন ও হাদিসে দান-সদকার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে বহু পুরস্কারের কথা বর্ণিত হয়েছে। তবে দান হতে হবে হালাল উপার্জন থেকে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং লোকদেখানো থেকে মুক্ত হয়ে।
রিজিক ও সম্পদে বরকত
দান করলে বাহ্যিক হিসাবে সম্পদ কমে গেলেও আল্লাহ তাতে বরকত দেন এবং দাতার জন্য উত্তম প্রতিদানের ব্যবস্থা করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-খয়রাতকে বর্ধিত করেন।’ (সুরা বাকারা: ২৭৬)
আল্লাহর পথে ব্যয় করাকে কোরআনে ‘উত্তম ঋণ’ বা ‘করজে হাসানা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘এমন কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে? অতঃপর তিনি তা তার জন্য বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন।’ (সুরা বাকারা: ২৪৫)
এর অর্থ এই নয় যে দান করলেই প্রত্যেক ব্যক্তি দুনিয়ায় নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ফেরত পাবেন। বরং আল্লাহ দানের প্রতিদান দুনিয়া বা আখিরাতে, যেভাবে ও যখন ইচ্ছা, প্রদান করেন। তাই মুমিনের দানের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের সওয়াব।
বিপদাপদ থেকে রক্ষার মাধ্যম
মানুষের জীবনে নানা ধরনের বিপদ, দুশ্চিন্তা ও সংকট আসে। মুমিন এসব পরিস্থিতিতে আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নেক আমল করে। দান-সদকা সেই নেক আমলগুলোর অন্যতম।
হাদিসে দান-সদকার মাধ্যমে আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচা এবং মন্দ পরিণতি থেকে রক্ষার কথা এসেছে। তিরমিজির একটি বর্ণনায় রয়েছে, ‘সদকা আল্লাহর ক্রোধ প্রশমিত করে এবং মন্দ মৃত্যু প্রতিহত করে।’ (জামে তিরমিজি: ৬৬৪)
তবে এ ধরনের হাদিসের অর্থ এভাবে নেওয়া উচিত নয় যে দান করলে মানুষের জীবনে কোনো বিপদ বা মৃত্যু আসবে না। বরং দান-সদকা আল্লাহর রহমত ও কল্যাণ লাভের একটি নেক আমল; এর প্রকৃত ফল ও প্রতিদান আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
পাপ মোচনের অন্যতম আমল
মানুষ ভুল-ত্রুটি ও গোনাহ থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। তাই তওবা ও ইস্তিগফারের পাশাপাশি নেক আমল করা জরুরি। দান-সদকা গোনাহ মোচনের অন্যতম মাধ্যম।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান-খয়রাত কর, তবে তা উত্তম; আর যদি তা গোপনে কর এবং অভাবগ্রস্তদের দিয়ে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম। আর তিনি তোমাদের কিছু গোনাহ মোচন করবেন। আল্লাহ তোমাদের কাজ সম্পর্কে সম্যক অবগত।’ (সুরা বাকারা: ২৭১)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, দান প্রকাশ্যে করা বৈধ হলেও গোপনে দান করা অনেক ক্ষেত্রে উত্তম- বিশেষত যদি এতে লোকদেখানোর আশঙ্কা থাকে। তবে জনকল্যাণমূলক কাজে অন্যদের উৎসাহিত করার প্রয়োজন হলে প্রকাশ্য দানও সওয়াবের কাজ হতে পারে, যদি নিয়ত সঠিক থাকে।
দানের প্রতিদান বহুগুণ
আল্লাহর পথে ব্যয়ের প্রতিদান কত বহুগুণ হতে পারে, কোরআনে তার চমৎকার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত একটি বীজের মতো, যা সাতটি শীষ উৎপন্ন করে; প্রত্যেক শীষে রয়েছে একশ দানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা বাকারা: ২৬১)
অর্থাৎ আল্লাহর পথে ব্যয় করা সম্পদের সওয়াব সাধারণ হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহ চাইলে তা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করতে পারেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসেও দানের বিপুল প্রতিদানের কথা এসেছে। তবে দানের সওয়াবের পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে হাদিসের বর্ণনাগুলো তাদের নিজ নিজ প্রেক্ষাপটে বোঝা জরুরি।
হালাল উপার্জন থেকে দান
দান কবুল হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সম্পদের পবিত্রতা। হারাম উপার্জন থেকে দান করে আল্লাহর কাছে বিশেষ সওয়াবের আশা করা যায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন।
সহিহ বুখারির একটি হাদিসে এসেছে, কেউ যদি তার হালাল ও পবিত্র উপার্জন থেকে একটি খেজুর পরিমাণও সদকা করে, আল্লাহ তা কবুল করেন এবং তার প্রতিদান বৃদ্ধি করতে থাকেন- অবশেষে তা বিশাল পরিমাণে পরিণত হয়। (সহিহ বুখারি: ৭৪৩০)
তাই দানের পরিমাণের চেয়ে উপার্জনের হালাল হওয়া, নিয়তের বিশুদ্ধতা এবং দানের যথাযথ খাতে ব্যয় হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কিয়ামতের দিন আল্লাহর ছায়ায় আশ্রয়
দানকারীর জন্য আখিরাতের অন্যতম বড় মর্যাদা হলো কিয়ামতের কঠিন দিনে আল্লাহর বিশেষ ছায়া লাভ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া থাকবে না। সেদিন যেসব মানুষ আল্লাহর বিশেষ ছায়া লাভ করবেন, তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও থাকবেন, যিনি এত গোপনে দান করেন যে তার বাম হাতও জানে না তার ডান হাত কী দান করেছে। (সহিহ বুখারি: ১৪২৩)
এই হাদিস গোপন দানের গুরুত্ব স্পষ্ট করে। কারণ এতে দাতার অন্তরে আত্মপ্রশংসা ও লোকদেখানোর প্রবণতা কম থাকে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিই মুখ্য হয়ে ওঠে।
দানের ক্ষেত্রে নিয়তই মূল
ইসলামে শুধু অর্থ ব্যয় করাই দান নয়; বরং দানের পেছনের নিয়তও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের প্রশংসা, সামাজিক মর্যাদা বা প্রচারের উদ্দেশ্যে দান করলে সেই আমলের আখিরাতের প্রতিদান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে, একজন মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প দান করেও আল্লাহর কাছে বড় প্রতিদান লাভ করতে পারেন। কারণ আল্লাহ মানুষের সম্পদের পরিমাণের পাশাপাশি তার নিয়ত, উপার্জনের পবিত্রতা ও আন্তরিকতাও বিবেচনা করেন।
তাই দান করার সময় দাতার উচিত- সম্পদ হালাল রাখা, লোকদেখানো থেকে বিরত থাকা, দানের গ্রহীতাকে অপমান না করা এবং প্রকৃত অভাবী ও কল্যাণকর খাতে সম্পদ ব্যয় করা।
দান শুধু সম্পদ কমিয়ে দেয় না; বরং মুমিনের জন্য এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, সম্পদে বরকত লাভ এবং আখিরাতের সঞ্চয় গড়ার অন্যতম মাধ্যম। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত দান-সদকা করা এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা একজন মুমিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল হতে পারে।
বাংলাদেশ সময়: ৬:৪৪:২৮ ● ২৫ বার পঠিত
