বৃহস্পতিবার ● ১৩ আগস্ট ২০২৬

কুয়াকাটা: পর্যটনের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই সময়

হোম » মতামত » কুয়াকাটা: পর্যটনের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই সময়
বৃহস্পতিবার ● ১৩ আগস্ট ২০২৬


 

কুয়াকাটা: পর্যটনের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই সময়

আব্দুল কাইয়ুম আরজু

 

বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা কুয়াকাটা কেবল একটি সমুদ্রসৈকতের নাম নয়; এটি একটি সম্ভাবনার নাম। এমন এক জনপদ, যেখানে একই দিগন্তে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের বিরল দৃশ্য প্রতিদিন নতুন করে পর্যটকদের মুগ্ধ করে। প্রকৃতি, সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় মানুষের জীবনসংগ্রাম- সব মিলিয়ে কুয়াকাটা বাংলাদেশের পর্যটনের এক অনন্য প্রতীক।

 

কিন্তু একটি প্রশ্ন ক্রমেই সামনে চলে আসছে- আমরা কি এই প্রতীককে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিতে পেরেছি?

 

একটি পর্যটন নগরীর সৌন্দর্য কেবল সমুদ্র, সড়ক বা অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ নয়। তার প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় নিরাপত্তা, সামাজিক শৃঙ্খলা, নৈতিক পরিবেশ এবং নাগরিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে। কারণ একজন পর্যটক শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে আসেন না; তিনি একটি সমাজকে দেখেন, একটি সংস্কৃতিকে অনুভব করেন এবং একটি দেশের চরিত্রকে মূল্যায়ন করেন।

 

দীর্ঘদিন ধরে কুয়াকাটার বিভিন্ন এলাকায় অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও বহু পর্যটকের আলোচনায় উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে অভিযোগের ধারাবাহিক পুনরাবৃত্তি নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সংকেত। একটি সমাজ যখন বছরের পর বছর একই উদ্বেগ বহন করে, তখন বিষয়টি আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়।

 

প্রশ্ন হলো, আমরা কি সমস্যার মূল কারণ খুঁজতে আগ্রহী, নাকি কেবল তার লক্ষণ নিয়েই আলোচনা করে সন্তুষ্ট?

 

যদি কোনো পর্যটন এলাকায় পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা মানুষ অস্বস্তি অনুভব করেন, যদি নারী ও শিশুরা নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যদি স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের সামাজিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন- তবে সেটি শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কারণ উন্নয়ন কখনোই শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর সবচেয়ে বড় মাপকাঠি মানুষের নিরাপত্তা, সামাজিক আস্থা এবং নৈতিক পরিবেশ।

 

কুয়াকাটার অর্থনীতি মূলত পর্যটননির্ভর। বর্তমান সময়ে একটি নেতিবাচক অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। একজন অসন্তুষ্ট পর্যটক হয়তো আর কখনো ফিরে আসবেন না; তাঁর অভিজ্ঞতা আরও বহু সম্ভাব্য পর্যটকের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে ক্ষতির পরিধি একটি হোটেল বা একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি এবং পর্যটনশিল্পের ভাবমূর্তি।

 

এখানেই জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ তাঁদের শুধু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচিত করেন না; একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও বাসযোগ্য সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করার নৈতিক দায়িত্বও তাঁদের ওপর অর্পিত হয়। একইভাবে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় নাগরিক সমাজ- সবাই এই দায়িত্বের অংশীদার। কোনো একটি পক্ষ এককভাবে কখনোই এই সংকটের কার্যকর সমাধান করতে পারবে না।

 

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো সমাজের নীরবতা। যখন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতা নিয়ে মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলতে সংকোচ বোধ করে, তখন সেই নীরবতা ধীরে ধীরে সমস্যাকে স্বাভাবিক করে তোলে। সামাজিক অবক্ষয়ের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক এখানেই- এটি একদিনে বিস্তার লাভ করে না; দীর্ঘদিনের উদাসীনতা একে আরও গভীর ও শক্তিশালী করে।

 

আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, আজকের শিশু-কিশোরেরা কী ধরনের সামাজিক পরিবেশে বেড়ে উঠছে? তারা কী দেখছে, কী শিখছে? তাদের সামনে আমরা কেমন একটি পর্যটন নগরীর চিত্র তুলে ধরছি? একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার নতুন প্রজন্মের মূল্যবোধের ওপর। সেই মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়লে কেবল আইন দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

 

তবে এই বাস্তবতা মোকাবিলার পথ কখনোই আবেগ বা প্রতিহিংসা নয়। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে প্রমাণ ছাড়া দোষারোপ করাও সমাধান হতে পারে না। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান, নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত হবে, অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে- এটাই আইনের শাসনের মৌলিক ভিত্তি।

 

একই সঙ্গে সামাজিক উদ্যোগও অপরিহার্য।

 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, ব্যবসায়ী সমিতি, হোটেল মালিক, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, তরুণ সমাজ এবং গণমাধ্যম- সবাইকে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। একটি সুস্থ পর্যটন পরিবেশ কেবল প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; এটি একটি সমষ্টিগত সামাজিক অঙ্গীকার।

 

কুয়াকাটাকে ঘিরে আমাদের ভাবনা শুধু বর্তমানের নয়, ভবিষ্যতেরও। আমরা কি এমন একটি জনপদ রেখে যেতে চাই, যেখানে আগামী প্রজন্ম গর্বের সঙ্গে বলবে-এটি একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও মূল্যবোধসম্পন্ন পর্যটন নগরী? নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে নীরবতা অন্যায়কে দীর্ঘস্থায়ী করবে?

 

আজ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে- আমরা কি সমস্যাকে অস্বীকার করব, নাকি সাহসের সঙ্গে তার মোকাবিলা করব?

 

একটি সমাজ তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সে নিজের দুর্বলতাকে স্বীকার করে এবং তা সংশোধনের পথ বেছে নেয়।

 

কুয়াকাটার প্রয়োজন কোনো আতঙ্কের পরিবেশ নয়; প্রয়োজন আস্থার পরিবেশ। প্রয়োজন এমন প্রশাসনিক দৃঢ়তা, যেখানে আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে। প্রয়োজন এমন জনপ্রতিনিধিত্ব, যেখানে জনস্বার্থ রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে স্থান পাবে। প্রয়োজন এমন নাগরিক সমাজ, যারা শুধু সমালোচনা করবে না, বরং সমাধানের অংশীদার হবে।

 

কুয়াকাটার সমুদ্র প্রতিদিন নতুন সূর্যের আগমন ঘোষণা করে। সেই সূর্য যেন শুধু প্রকৃতির নয়, আমাদের সামাজিক বিবেকেরও নতুন ভোরের প্রতীক হয়ে ওঠে।

 

একটি পর্যটন নগরীর ভবিষ্যৎ রক্ষা মানে কেবল অর্থনীতি রক্ষা নয়; একটি সমাজের আত্মমর্যাদা, সংস্কৃতি এবং আগামী প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়িত্ব রক্ষা করা।

 

কুয়াকাটাকে রক্ষা করা মানে বাংলাদেশের পর্যটনের ভবিষ্যৎ, সামাজিক মূল্যবোধ এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি রক্ষা করা।

 

এখন প্রশ্ন একটাই- আমরা কি সেই দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত?

 

লেখক- একজন সংবাদকর্মী, সমাজ ও পরিবেশকর্মী।

বাংলাদেশ সময়: ৯:২৩:০২ ● ২১ বার পঠিত