সোমবার ● ২৭ জুলাই ২০২৬
সাংবাদিকের ওপর হামলা: রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনের শাসনই শেষ কথা
হোম » সম্পাদকীয় » সাংবাদিকের ওপর হামলা: রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনের শাসনই শেষ কথা
কুয়াকাটায় দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধি কে এম বাচ্চুর ওপর হামলার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে একজন সাংবাদিককে প্রকাশ্যে মারধরের অভিযোগ শুধু একজন ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনা নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার নিরাপত্তা এবং আইনের শাসনের ওপর সরাসরি আঘাতের অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, দুই ব্যক্তি হাতুড়ি নিয়ে সাংবাদিক কে.এম বাচ্চুর ওপর হামলা চালান। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ঘটনাটি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন অভিযোগের তীর স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের দিকে ওঠে। তবে অভিযোগ উঠলেই কেউ অপরাধী প্রমাণিত হন না- এটি যেমন ঠিক, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ব্যক্তিকে আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগও দেয় না।
রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর স্থানীয় নেতৃত্বের বক্তব্যে তদন্ত সাপেক্ষে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এটি ইতিবাচক অবস্থান। কিন্তু শুধু সাংগঠনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। হামলার অভিযোগ সত্য হলে ফৌজদারি আইনে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আবার অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট করতে হবে। অর্থাৎ, কোনো পক্ষের রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বা সামাজিক অবস্থান যেন তদন্তকে প্রভাবিত না করে- এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিকরা সংবাদ প্রকাশ করবেন, কেউ এতে ক্ষুব্ধ হতে পারেন, প্রতিবাদ করতে পারেন, আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন। কিন্তু সংবাদ পছন্দ না হওয়া কাউকে সাংবাদিকের ওপর হামলা চালানোর অধিকার দেয় না। সংবাদে ভুল থাকলে তার প্রতিবাদ ও সংশোধনের পথ আছে; মানহানি বা অন্য কোনো অভিযোগ থাকলে আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ আছে। হাতুড়ি কিংবা লাঠিসোঁটা দিয়ে তার জবাব দেওয়ার কোনো বৈধতা নেই।
কুয়াকাটা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। সেখানে প্রকাশ্য স্থানে একজন সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ শুধু সাংবাদিক সমাজের জন্য নয়, স্থানীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যও প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে পর্যটননির্ভর একটি এলাকায় এমন ঘটনা ঘটলে সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের মধ্যেও অনিরাপত্তার বার্তা যেতে পারে।
আমরা আশা করি, মহিপুর থানা অভিযোগ পাওয়ার পর নিরপেক্ষ, দ্রুত ও পেশাদার তদন্ত করবে। প্রত্যক্ষদর্শী, ঘটনাস্থলের সম্ভাব্য ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা বের করতে হবে। অভিযোগ সত্য হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে-তারা যে রাজনৈতিক সংগঠনেরই হোক না কেন।
রাজনৈতিক দলগুলোও এই ঘটনায় নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করবে বলে প্রত্যাশা করি। কোনো সংগঠনের নাম ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তাকে রক্ষা করা নয়, বরং আইনের হাতে তুলে দেওয়াই রাজনৈতিক সংগঠনের দায়িত্ব। কারণ অপরাধীর পরিচয় যদি দলীয় পরিচয়ে ঢাকা পড়ে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন সাংবাদিক নন- ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজের ন্যায়বিচারের বিশ্বাস।
সাংবাদিকের কলম থামাতে হামলা কোনো সমাধান নয়। সংবাদে আপত্তি থাকলে জবাব দিতে হবে তথ্য দিয়ে, আইনি পথে। কুয়াকাটার এই ঘটনায় তাই একটাই দাবি- অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, সত্য উদঘাটিত হোক এবং দায়ী যে-ই হোক, আইনের আওতায় আনা হোক।
বাংলাদেশ সময়: ৭:২০:৪০ ● ৩০ বার পঠিত
