শুক্রবার ● ১০ জুলাই ২০২৬

জোছনা উৎসব নিয়ে সংশয় ভাঙনে সৌন্দর্য হারাচ্ছে তালতলীর শুভ সন্ধ্যা সৈকত

হোম » বরগুনা » জোছনা উৎসব নিয়ে সংশয় ভাঙনে সৌন্দর্য হারাচ্ছে তালতলীর শুভ সন্ধ্যা সৈকত
শুক্রবার ● ১০ জুলাই ২০২৬


ভাঙনে সৌন্দর্য হারাচ্ছে তালতলীর শুভ সন্ধ্যা সৈকত

 

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বরগুনা

 

বরগুনার তালতলীর শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত দিন দিন হারাচ্ছে তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সাগরের জোয়ার-ভাটার প্রবল ঢেউ, নদীভাঙন, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণে সৈকতের ঝাউবন বিলীন হচ্ছে, সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। এতে পর্যটকদের নিরাপদ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পর্যটন সম্ভাবনাও হুমকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে সৈকতের বিশাল বালুচরে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী জোছনা উৎসবের ভবিষ্যৎ নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়।

পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, তালতলী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়া এলাকায় অবস্থিত শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর- এই তিন নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা একটি অনন্য পর্যটন কেন্দ্র। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, দীর্ঘ ঝাউবন এবং সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের জন্য এটি পর্যটকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে আকর্ষণের কেন্দ্র।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জোয়ার-ভাটা, উত্তাল ঢেউ ও ভাঙনের কারণে সৈকতের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝাউগাছ উপড়ে পড়ছে, তীরের বালু সরে যাচ্ছে এবং পর্যটন অবকাঠামোও ঝুঁকিতে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণেও সৈকতের বিশাল বালুচর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এলাকাবাসীর আশঙ্কা, ভাঙন অব্যাহত থাকলে শুধু পর্যটনই নয়, শুভ সন্ধ্যার অন্যতম আকর্ষণ ঐতিহ্যবাহী জোছনা উৎসবও বিলুপ্তির পথে যেতে পারে।

জানা যায়, বরগুনার তরুণ উদ্যোক্তা, সাংবাদিক ও আইনজীবী সোহেল হাফিজের উদ্যোগে ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবর বিষখালী নদীর মোহনায় বাইনচটকির চরে প্রথম জোছনা উৎসবের আয়োজন করা হয়। প্রকৃতিনির্ভর সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলা এবং নির্মল বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি ছিল এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। রাতব্যাপী এ উৎসবে সংগীত, কবিতা আবৃত্তি, পুঁথি পাঠ, প্যারোডি, বাঁশিবাদনসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট বরগুনার সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শাহজাহান মিয়া ও অ্যাডভোকেট সোহেল হাফিজের উদ্যোগে প্রথম আয়োজন সফল হওয়ার পর প্রতিবছর উৎসবটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। সাধারণত কার্তিক-অগ্রহায়ণ বা অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসের পূর্ণিমার রাতে শুভ সন্ধ্যার বিশাল বালুচরে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হতো। হাজারো দর্শনার্থী চাঁদের আলোয় বাউল, জারি গান, কবিতা আবৃত্তি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন।

পরবর্তীতে জেলা প্রশাসন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় উৎসব আয়োজনের দায়িত্ব নেয়। ২০১৮ সালে ২৩ নভেম্বর এবং ২০১৯ সালে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল-এর কারণে তারিখ পরিবর্তন করে ১২ ডিসেম্বর জোছনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

জোছনা উৎসবের উদ্যোক্তা অ্যাডভোকেট সোহেল হাফিজ বলেন, ‘২০১৫ সালে আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থানীয় সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ব্যক্তিদের নিয়ে প্রথম জোছনা উৎসবের আয়োজন করি। ২০১৬ ও ২০১৭ সালেও আমার নেতৃত্বে উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সাল থেকে জেলা প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে আয়োজনের দায়িত্ব নেয়।’

তিনি জানান, ২০১৮ সালের উৎসব উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন বরগুনার জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ। সে সময় তিনি বলেছিলেন, বরগুনার জোছনা উৎসব একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জোছনা উৎসবে পরিণত হবে।

 

২০১৯ সালে পঞ্চম জোছনা উৎসব উদ্বোধন করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাইন বিল্লাহ।

পর্যটন-সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কার্যকর ভাঙনরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সৈকতের পরিবেশ সংরক্ষণ করা গেলে শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত আবারও দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। অন্যথায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি হারিয়ে যেতে পারে এ অঞ্চলের অন্যতম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য- জোছনা উৎসব।

বাংলাদেশ সময়: ১২:০২:৫৬ ● ৪২ বার পঠিত