মঙ্গলবার ● ৭ জুলাই ২০২৬
মসলার দোকান থেকে প্রশাসন ক্যাডার, ভাণ্ডারিয়ার মাহমুদের অনন্য সাফল্য
হোম » শিক্ষা » মসলার দোকান থেকে প্রশাসন ক্যাডার, ভাণ্ডারিয়ার মাহমুদের অনন্য সাফল্য
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর)
দারিদ্র্য, অভাব আর বাবার ছোট্ট মসলার দোকান এই ছিল শৈশবের বাস্তবতা। সেই বাস্তবতাকে হার মানিয়ে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার কৃতি সন্তান মো. মাহমুদ আকন ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। একই পরীক্ষায় উপজেলার আরেক মেধাবী শিক্ষার্থী মো. আবুল কাশেম সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের (ম্যানেজমেন্ট) জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। দুই তরুণের এ সাফল্যে আনন্দের জোয়ার বইছে ভাণ্ডারিয়াজুড়ে।
মাহমুদ আকন পৌর শহরের পূর্ব ভাণ্ডারিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মো. মোজাম্মেল হোসেন আকনের সাত সন্তানের মধ্যে একমাত্র ছেলে। ভাণ্ডারিয়া কেন্দ্রীয় বাইতুল ইসলাম জামে মসজিদের পাশের বাবার ছোট্ট মসলার দোকানই ছিল নয় সদস্যের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। সংসারের প্রয়োজনে ছোটবেলা থেকেই বাবার দোকানে কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু দারিদ্র্য কখনো তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
মাহমুদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় ভাণ্ডারিয়া শাহাবুদ্দিন সিনিয়র কামিল মাদ্রাসায়। সেখান থেকে দাখিলে জিপিএ-৪.৭৮ ও আলিমে জিপিএ-৪.৬৭ অর্জনের পর তিনি আমান উল্লাহ ডিগ্রি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন এবং অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। পরে সরকারি বিএম কলেজে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত অবস্থায় বিসিএসের প্রস্তুতি নেন। প্রথম চেষ্টাতেই প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে তিনি নিজের অধ্যবসায়ের স্বীকৃতি অর্জন করেন।
মাহমুদের প্রাক্তন শিক্ষক মনোয়ার হোসেন বলেন, ছোটবেলা থেকেই মাহমুদ অত্যন্ত মেধাবী, বিনয়ী ও পরিশ্রমী ছিল। চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি তার নিষ্ঠা ছিল অসাধারণ। আজ তার এই অর্জনে আমরা গর্বিত।
ছেলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা মো. মোজাম্মেল হোসেন আকন বলেন, অভাবের সংসারে দোকানের কাজের পাশাপাশি সে নিয়মিত পড়াশোনা করেছে। কখনো হাল ছাড়েনি। আজ ছেলের বিসিএসে সফল হওয়ার খবর আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে মাহমুদ আকন বলেন, আমার এই অর্জনের পেছনে মহান আল্লাহর রহমত, বাবা-মায়ের ত্যাগ, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং বন্ধুদের সহযোগিতা রয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলে সততা, নিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে কাজ করতে চাই। সবার কাছে দোয়া কামনা করছি।
অন্যদিকে উপজেলার দক্ষিণ মাটিভাঙ্গা গ্রামের কৃতি সন্তান মো. আবুল কাশেম ৪৭তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের (ম্যানেজমেন্ট) জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তিনি মরহুম হুকুম আলী ও আলেয়া বেগমের সন্তান।
আবুল কাশেম পৈকখালী হাজী এস.এম. জামান মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৪.৭৮ এবং আমান উল্লাহ ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস (এমআইএস) বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে বিসিএসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করেন।
আমান উল্লাহ ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সালমা আক্তার বলেন, একই কলেজের দুই শিক্ষার্থীর এমন সাফল্য আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। শিক্ষাজীবন থেকেই তারা মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়েছে। তাদের এই অর্জন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করবে।
ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাসিবুল হাসান বলেন, মফস্বলের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও কঠোর পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাস থাকলে জাতীয় পর্যায়ের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়ও সফল হওয়া সম্ভব। মাহমুদ আকন ও আবুল কাশেম সেই উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।
মাহমুদ ও আবুল কাশেমের এই অর্জন শুধু দুই পরিবারের নয়, ভাণ্ডারিয়ারও গর্ব। স্থানীয়দের প্রত্যাশা সততা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে তারা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবেন।
বাংলাদেশ সময়: ১৬:০৩:০৮ ● ২০ বার পঠিত
