শুক্রবার ● ১৭ জুলাই ২০২৬
বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা: ঐতিহ্যের জীবন্ত উত্তরাধিকার
হোম » সর্বশেষ » বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা: ঐতিহ্যের জীবন্ত উত্তরাধিকার
এম জাকির হোসাইন
বাংলা ভাষার বিশাল ভাণ্ডারের অন্যতম সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় উপভাষা বরিশাল অঞ্চলের আঞ্চলিক কথ্য ভাষা। এর নিজস্ব উচ্চারণ, শব্দভাণ্ডার, বাক্যগঠন ও অভিব্যক্তি শুধু ভাষাগত বৈশিষ্ট্যই নয়, বরং দক্ষিণ বাংলার নদীমাতৃক জনপদের ইতিহাস, লোকজ সংস্কৃতি, জীবনসংগ্রাম এবং সামাজিক বিবর্তনের এক অনন্য দলিল। ভাষাবিদদের মতে, বরিশালের ভাষা একটি স্বতন্ত্র উপভাষার পরিচয় বহন করে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মুখে মুখে বেঁচে আছে।
বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি এবং বরগুনাসহ বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে ব্যবহৃত এই উপভাষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর স্বতন্ত্র উচ্চারণরীতি। অনেক শব্দ এমনভাবে উচ্চারিত হয়, যা প্রমিত বাংলার ধ্বনিতত্ত্বে পুরোপুরি প্রকাশ করা কঠিন। উদাহরণ হিসেবে ‘হাট’ শব্দটির উচ্চারণ এখানে ‘হা’ ও ‘আ’-এর মাঝামাঝি এক বিশেষ ধ্বনিতে উচ্চারিত হয়, যার সুনির্দিষ্ট লিখিত রূপ বাংলা বর্ণমালায় নেই। একইভাবে ‘যাব’, ‘করব’, ‘তোমাদের’, ‘আমাদের’ শব্দগুলো স্থানীয় উচ্চারণে হয়ে যায় ‘যামু’, ‘করমু’, ‘তোগো’, ‘মোগো’- যা ভাষাটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র সুর ও ছন্দ।
ভাষাবিজ্ঞানীরা মনে করেন, একটি অঞ্চলের ভাষা গড়ে ওঠে তার ভৌগোলিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক জীবন, পেশাগত বৈচিত্র্য এবং সামাজিক ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে। বরিশালের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অসংখ্য নদ-নদী, খাল-বিল, চরাঞ্চল, জোয়ার-ভাটা, নদীভাঙন এবং জলনির্ভর জীবনযাপন এখানকার মানুষের ভাবপ্রকাশ, শব্দচয়ন ও ভাষার ধ্বনিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ফলে এখানকার ভাষায় প্রকৃতি ও জীবিকার ছাপ অত্যন্ত স্পষ্ট।
এ অঞ্চলে বাওয়ালি, জেলে, মাঝি, কুডিয়াল, কৃষক, পাটিয়াল, নৌকার কারিগর, লবণ ও মাছ ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের দীর্ঘদিনের সহাবস্থান ভাষাকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। নদী, মাছ ধরা, নৌযান, কৃষিকাজ, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস কিংবা উপকূলীয় জীবনকে ঘিরে অসংখ্য শব্দ ও পরিভাষা গড়ে উঠেছে, যেগুলোর অনেকগুলোর প্রমিত বাংলায় সরাসরি সমার্থক শব্দ নেই।
ঐতিহাসিকভাবে বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চল একসময় ‘বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ’ নামে পরিচিত ছিল। মধ্যযুগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে আরাকান, পর্তুগিজ, মুঘল ও ব্রিটিশ শাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব এ অঞ্চলের সমাজ ও সংস্কৃতিকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি ভাষার মধ্যেও যুক্ত হয়েছে নতুন শব্দ, ধ্বনি ও অভিব্যক্তি। ফলে বরিশালের ভাষা কেবল একটি স্থানীয় কথ্যরীতি নয়; এটি বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক মেলবন্ধনেরও সাক্ষ্য বহন করে।
লোকসংস্কৃতির বিশাল ভাণ্ডারও এই ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। জারি, সারি, ভাটিয়ালি, পালাগান, কবিগান, গাজীর গান, মুর্শিদি ও বিভিন্ন লোকগাথায় বরিশালের ভাষার সহজ-সরল অথচ আবেগঘন ব্যবহার লক্ষ করা যায়। নদীকেন্দ্রিক জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম, বিচ্ছেদ, সংগ্রাম, আশা-নিরাশা এবং মানুষের জীবনদর্শন এসব লোকগানে প্রাণবন্তভাবে ফুটে ওঠে।
গ্রামীণ খেলাধুলা ও জীবনযাপনের সঙ্গেও ভাষার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। একসময় বরিশালের গ্রামাঞ্চলে দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, ডাঙ্গুলি, লুটলুট, পানিঝুপ্পা, কানামাছি, লাঠিখেলা কিংবা নৌকাবাইচ ছিল মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। একই সঙ্গে কাঠামি নাও, গয়না নৌকা, তালের ডোঙ্গা, ডিঙ্গি নৌকা প্রভৃতি ঐতিহ্যবাহী জলযান এবং শোলাশিল্প, কাঁথাশিল্প, পাটশিল্প, বাঁশ ও বেতের কারুশিল্প স্থানীয় সংস্কৃতিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়, যার প্রতিফলন ভাষাতেও দেখা যায়।
বরিশালের প্রবাদ-প্রবচন মানুষের জীবনবোধ, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকে সহজ ভাষায় প্রকাশ করে। যেমন প্রমিত বাংলার ‘কষ্ট ছাড়া কেষ্ট মেলে না’ প্রবাদটির বরিশালি রূপ- ‘ওল না ভিজাইলে ঝোল খাওয়া যায় না’। আবার ‘যার লাঠি তার মাটি’, ‘আগে পেট, পরে ভেট’, ‘যার কাম তারে সাজে’- এ ধরনের অসংখ্য স্থানীয় প্রবচন মানুষের জীবনদর্শনের পরিচয় বহন করে।
শিশুদের ছড়া, খেলাধুলার গান ও পারিবারিক কথোপকথনেও বরিশালের ভাষার মাধুর্য ধরা পড়ে। যেমন- ‘মোগো মোনু ভালো, আম টোহাইতে গ্যালো’- এখানে ‘মোগো’ অর্থ আমাদের, ‘মোনু’ অর্থ শিশু এবং ‘টোহাইতে’ অর্থ তুলতে। এসব শব্দ ও ছড়া শুধু শিশুদের আনন্দের উপকরণ নয়; এগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভাষা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
ভাষাবিদদের মতে, উপভাষা কোনো ভাষার দুর্বলতা নয়; বরং সেটিই একটি ভাষার প্রাণশক্তি ও বৈচিত্র্যের উৎস। বরিশালের আঞ্চলিক ভাষাও তেমনি বাংলা ভাষার এক অমূল্য সম্পদ। তবে নগরায়ণ, গণমাধ্যমের বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং প্রমিত ভাষার ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে নতুন প্রজন্মের অনেকেই ধীরে ধীরে স্থানীয় শব্দ ও উচ্চারণ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে ভাষার অনেক প্রাচীন শব্দ, লোকছড়া, প্রবাদ-প্রবচন ও মৌখিক ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গবেষকরা মনে করেন, বরিশালের এই ভাষা ও লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য এখনই পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় শব্দভাণ্ডার সংগ্রহ, আঞ্চলিক অভিধান প্রণয়ন, লোকসাহিত্য সংরক্ষণ, মৌখিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্থানীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই অমূল্য ভাষিক ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা তাই কেবল কথোপকথনের মাধ্যম নয়; এটি নদী, প্রকৃতি, মানুষ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনবোধের এক জীবন্ত উত্তরাধিকার- যা বাংলা ভাষার বৈচিত্র্যকে করেছে আরও সমৃদ্ধ, আরও প্রাণবন্ত।
লেখক: সাহিত্যিক, আঞ্চলিক ভাষা গবেষক ও কুয়াকাটা খানাবাদ কলেজের সহকারী অধ্যাপক
বাংলাদেশ সময়: ১০:১৯:৩৭ ● ২৯ বার পঠিত
