স্বপ্ন নয় পায়রা সমুদ্র বন্দর এখন দৃশ্যমান
হোমপেজ » কলাপাড়া উপজেলা » স্বপ্ন নয় পায়রা সমুদ্র বন্দর এখন দৃশ্যমান


রবিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

পায়রা সমুদ্র বন্দরে দৃশ্যমান উন্নয়ন প্রকল্প

মেজবাহউদ্দিন মাননু, সাগরকন্যা প্রতিবেদন ॥
পায়রা সমুদ্র বন্দর এখন আর স্বপ্ন নয়, দৃশ্যমান। যেখান থেকে দেশের অর্থনৈতিক যোগান আসছে। নতুন বছরের মাস যেতেই দুইটি মাদার ভ্যাসেল পণ্য খালাশ করেছে। প্রত্যেকটি জাহাজ থেকে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব আয় হয়েছে। এছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ব্যবহার করা বাবদ প্রত্যেকটি জাহাজ থেকে পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকা আয় করছে। একেকটি জাহাজে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মেট্রিকটন পণ্য আসছে। এ বছরের সম্ভাব্য টার্গেট ২০-২৫টি মাদার ভ্যাসেল পায়রা বন্দরে পণ্য খালাশ করবে।

বন্দরসূত্রে জানাগেছে, ২০১৬ সালে এ বন্দরে সাতটি এবং ২০১৭ সালে ছয়টি মাদার ভ্যাসেল পণ্য খালাশ করেছে। ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর কলাপাড়ার টিয়াখালীতে দেশের তৃতীয় পায়রা বন্দরের প্রকল্প কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অবহেলিত অজপাড়াগাঁয়ের অর্থনৈতিক দিন বদলের গোড়াপত্তন করেছিলে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। যেন দেশে গড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে এ বন্দরের কার্যক্রম শুরু করেন তিনি। যার সফলতা শুরু হয় ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট। বন্দরটি অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু হয় ওই দিন।  এখন পর্যন্ত নৌপথে পণ্য খালাশের কার্যক্রম চলছে। কর্মচঞ্চল থাকছে রামনাবাদে এক-দেড় শ’ দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক। সবচেয়ে সফলতার খবর জানালেন বন্দর কর্তৃপক্ষ সড়ক পথে কন্টেনারবাহী পণ্য পায়রা বন্দর থেকে খালাশ কার্যক্রম চালুর সম্ভাবনার কথা। যা শুরু হবে এ বছরের অক্টোবর মাসে। এ লক্ষ্যে পায়রা বন্দর থেকে ঢাকাগামী মহাসড়কের সঙ্গে প্রায় ছয় কিলোমিটার ফোরলেন সড়কের কাজ করছেন দ্রুত গতিতে। ইতোমধ্যে সড়কটির প্রায় দেড় কিঃমিঃ এলাকায় মালবাহী ট্রাক চলাচল উপযোগী হয়েছে।

পায়রা বন্দর এখন আর কাঙ্খিত স্বপ্ন কিংবা আশ^াসের বাণীর জায়গায় নেই। দৃশ্যমান বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটেছে। বন্দর প্রকল্প এলাকায় এখন দৃশ্যমান উন্নয়ন চোখে পড়ে। চোখ ধাধানো সেই উন্নয়ন কর্ম। ইতোমধ্যে পায়রা বন্দরে আসা মালামাল সংরক্ষণের জন্য নবনির্মিত ওয়্যার হাউসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রায় ২১ কোটি টাকার চুক্তিমূল্যে ওয়্যার হাউসটি নির্মিত হয় এক লাখ বর্গফুট জায়গা নিয়ে। যার দৈর্ঘ ৪০০ ফুট এবং প্রস্থ ২৫০ ফুট এবং উচ্চতা ২০ ফুট। ওয়্যার হাউস থেকে মালামাল ডেলিভারির জন্য ৩২ হাজার ৮০০ বর্গফুট ইয়ার্ড নির্মাণ করা হয়েছে। করা হয়েছে ১১৫০ ফুট দীর্ঘ এবং ২২ ফুট প্রশস্থ আরসিসি সড়ক। এছাড়া ২১ কোটি ৩৮ লাখ ৮৫ হাজার ২৬৮ টাকা ৯১ পয়সা চুক্তিমূল্যে একটি সার্ভিস জেটি। পন্টুন জেটির পাশেই এই জেটি নির্মিত হচ্ছে। ২৭ জুন এই সার্ভিস জেটির কাজ শেষ হওয়ার কথা। ৮০ মিটার দীর্ঘ এবং ২৪ মিটার প্রস্থ এই সার্ভিস জেটিতে সরাসরি পাঁচ মিটার ড্রাফট পন্যবাহী জাহাজ ভিড়তে পারবে।
প্রাথমিকভাবে ১৬ একর জমিতে পায়রা বন্দর প্রকল্প এলাকা নির্মাণ করা হয়।

বন্দরের পরিচালক (নিরাপত্তা) লেফটেন্যান্ট কমান্ডার কেএম জাহাঙ্গীর আলম জানান, ভূমি উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত করে বাউন্ডারি দেয়ালের কাজ আগেই শেষ করা হয়েছে। পাঁচ তলা বিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে। নির্মিত হয়েছে পানি শোধনাগার, যেখান থেকে দৈনিক দুই হাজার টন নিরাপদ পানি সরবরাহ করা যাবে। কাস্টমসসহ নিরাপত্তা ভবন নির্মিত হয়েছে আগেই। নদীরপাড় ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে (অস্থায়ী) অফিস ভবন। স্থাপিত হয়েছে লাইটার জাহাজ থেকে পণ্য খালাশের টার্মিনাল। বেইলিব্রিজসহ সংযোগ সড়ক নির্মিত হয়েছে। সোলার বাতিসহ বিদ্যুত সরবরাহ চালু করা হয়েছে। সাবমেরিন কেবল লাইন টানা হয়েছে। সাগর মোহনা থেকে মূল চ্যানেলের নেভিগেশনাল বয়া স্থাপন করা হয়েছে। স্থাপিত হয়েছে সীগনাল বাতি। সাগর থেকে চ্যানেলের ইনার সাইটে ২৮টি বয়াবাতি সেট করা হয়েছে। রামনাবাদ থেকে তেতুলিয়া নদীতে বরিশাল হয়ে ঢাকার মেঘনা নদীর হিজলা পর্যন্ত প্রায় ২০ নটিক্যাল মাইল নদী খনন করা হয়েছে। যেখানে পাঁচ মিটার নাব্যতা বজায় রাখা হয়েছে। এ চ্যানেলেও ৪৬টি বয়াবাতি স্থাপন করা হয়েছে। গোটা চ্যানেলটিতে ১০ মিটার নাব্যতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে বেলজিয়ামের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। যা শীঘ্রই বাস্তবায়ন হচ্ছে। সাগর বক্ষ থেকে মূল চ্যানেলে ২৩৩ মিটার দীর্ঘ জাহাজ পণ্য নিয়ে ইতোমধ্যে খালাশ করেছে। সাগরের প্রবেশদ্বার থেকে রামনাবাদ মূল চ্যানেল অভ্যন্তরে শত শত জাহাজ অবস্থানের সুযোগ রয়েছে।

দ্রুতালয়ে চলছে পায়রা বন্দরের সঙ্গে মহাসড়কের সরাসরি যোগাযোগে পাঁচ দশমিক ৬০ কিমি দীর্ঘ ফোরলেন সড়কের নির্মাণ কাজ। এজন্য ২৫৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয়-বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে বালুর পাইলিংএর উপর কংক্রিটে নির্মাণ হচ্ছে এ সড়কটি। বন্দর সংলগ্ন ট্রাক স্টান্ডের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহন করা হয়েছে। বন্দর সার্ভিস সুবিধার জন্য বিভিন্ন ধরনের জলযান (হাই-স্পিড) নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। চালু হয়েছে সিএন্ডএফ এজেন্ট ক্লিয়ারেন্স এবং ইমিগ্রশনের কাজ। ইতোমধ্যে ৬২ জন বিদেশী নাগরিকের ইমিগ্রেশন সুবিধা দেয়া হয়েছে এ বন্দর থেকে।

পায়রা বন্দর চালু হওয়ায় এখানকার মৌসুমী কৃষি শ্রমিকসহ জেলে পরিবারের অদক্ষ শ্রমিকরা পেয়েছেন কর্মসংস্থান। অন্তত পাঁচ শ’ অদক্ষ শ্রমিক পায়রা বন্দরের কর্মযজ্ঞে শামিল হয়েছেন। স্থানীয় কেউ কেউ পেয়েছেন গাড়ি চালকসহ নিরাপত্তার চাকরি। চলমান রয়েছে আরও বিভিন্ন পর্যায়ের শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়া। বিকল্প জীবিকার পথ পেয়ে এ মানুষগুলো আপাতত স্বস্তিতে রয়েছেন।

জানাগেছে, পূর্ণাঙ্গভাবে বন্দরের কার্যক্রম চালু করতে তিন বছর মেয়াদী উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয় এক বছর আগে। যার অর্ধেকটা যার মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে ওয়্যার হাউস নির্মাণ, রামনাবাদ চ্যানেল থেকে কালীগঞ্জ নৌপথের বিভিন্ন স্পটে ড্রেজিং, প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ। প্রক্রিয়াধীন রয়েছে হাইস্পিড, পাইলট ও টাগবোট সংগ্রহ, বয়া লেয়িং ভ্যাসেল, সার্ভে ভ্যাসেল। শুরু হয়েছে সার্ভিস পন্টুন স্থাপনসহ সেতু নির্মাণ। পাঁচ কোটি ৭২ লাখ টাকা চুক্তিমূল্যে বহুমুখি সুবিধা সংবলিত পাঁচতলা ভবনের নির্মাণ কাজও শুরু হয়েছে। এর অধিকাংশ চলছে আবার অনেকটা সম্পন্ন করা হয়েছে। এছাড়া সাত হাজার একর জমি অধিগ্রহণের কাজও চলছে। পাশাপাশি এসব জমির মালিকদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হলে পায়রা বন্দর হতে যাচ্ছে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বন্দর। পায়রা বন্দর এলাকায় নিরাপত্তার কোন শঙ্কা নেই। কারণ এখানে দেশের সর্ববৃহৎ শের-ই-বাংলা নৌঘাটি নির্মিত হচ্ছে। নৌপথ থাকছে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তায়। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ক্লিয়ারিং এন্ড ফরোয়ার্ডিং এজেন্সী তাদের ব্যবসার সম্প্রসার ঘটাতে জায়গা-জমি কিনেছেন। গড়ে উঠেছে একাধিক শ্রমিক সংগঠন। মোট কথা পায়রা বন্দরকে ঘিরে বিরাজ করছে সাগরপাড়ের কলাপাড়া অঞ্চলের মানুষের মাঝে এক ধরনের উচ্চাকাঙ্খা। যেন প্রত্যাশার সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষ প্রাপ্তির যোগসুত্র খুঁজে পেয়েছে। দেখছেন এর বাস্তব প্রতিফলন। এক কথায় পায়রা বন্দর এখন আর স্বপ্ন নয়। এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। দেশের অর্থনীতিতে যোগান দিতে শুরু করেছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। প্রতিনিয়ত বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এখন পরিদর্শন করছেন পায়রা বন্দর।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ মাহবুবুর রহমান এমপি বলেন, ‘পায়রা বন্দর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফসল। দখিনের এই জনপদের মানুষকে উন্নত জীবনধারায় অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার জন্য পায়রা বন্দরসহ উন্নয়নের মহাযজ্ঞ করে যাচ্ছেন। তার দিক নির্দেশনায় আমরা কর্মী হয়ে মাত্র যোগান দিচ্ছি।’

এমইউএম/কেএস


বাংলাদেশ সময়: ১১:১৯:৩০ এএম | ৮৯৭ বার পঠিত


পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

পুরনো খবর দেখতে:



---

আরো পড়ুন...