বঙ্গবন্ধুর বাড়ি নিয়ে উপন্যাস ‘ধানমন্ডি ৩২ নম্বর’
হোমপেজ » সাহিত্য-সংস্কৃতি » বঙ্গবন্ধুর বাড়ি নিয়ে উপন্যাস ‘ধানমন্ডি ৩২ নম্বর’


বুধবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

শামস সাইদ

ক্লিনটন জ্যাক ॥

ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বলতে আমরা বুঝি একটা বাড়ির কথা। আসলে ৩২ নম্বর কোন বাড়ি নয়। একটি সড়ক। এই সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে বাস করতেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িটি বাকিংহাম প্যালেস, হোয়াইট হাউস, ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট, রাইসিনা হিল কিংবা ক্রেমলিনের মতো সরকারি মর্যদা ছিল না। বা নাই। ছিল না কোন নামও। তবে এই বাড়িটি বাঙালি জাতির ভালোবাসার রাজ্যে এক অন্যান্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। এই বাড়িটির আলাদা একটা ইতিহাস আছে। যা পৃথিবীর অন্যকোন বাড়ির নেই বলে মনে হয়।

১৯৬২ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন শুরু হয়। বাঙালির মনের মধ্যে দানা বাঁধতে থাকা অসন্তোষ। বাড়তে থাকে অপশাসনের হাত থেকে মুক্তির আকাঙ্খা। শেখ মুজিবুর রহমান দিন দিন আরো বেশি গণমানুষের নেতা হয়ে উঠতে থাকেন। আর ৩২ নম্বরের এই বাড়িও হয়ে উঠতে থাকে মুক্তির প্রতীক। গণমানুষের ভরসা ও আশ্রয়স্থল। ১৯৬২ সালের আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ’৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ’৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন, ’৭১ সালের শুরুতে অসহযোগ আন্দোলন- এসব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বঙ্গবন্ধু পরিকল্পনা করা, নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সবই করেছেন এই ৩২ নম্বর বাড়িতে। ’৭১-এর উত্তাল দিনগুলোয় দেশি-বিদেশি সাংবাদিকরাও জাতির পিতার সঙ্গে দেখা করার জন্য এখানে ভিড় করেছিলেন। এ ছাড়া ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের রূপরেখাও এ বাড়িতেই তৈরি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ২৩ মার্চ এই বাড়িতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে এই বাড়িতে বসে বঙ্গবন্ধু যে নির্দেশ দিতেন সে অনুসারেই  চলত দেশ ও বাঙালি জাতি। দৈনিক আজাদ পত্রিকা লিখেছিল ‘বিশ্ববাসীর কাছে আজ দিবালোকের মত স্পষ্ট যে বাংলার শাসন ক্ষমতা এখন আর সামরিক কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারে নাই বরং তা সাতকোটি মানুষের ভালোবাসার শক্তিতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর এখন বাংলার শাসন ক্ষমতার একমাত্র উৎস হইয়া পড়িয়াছে।’

বঙ্গবন্ধুর বাসভবন তখন অঘোষিত সরকারি সদর দপ্তরে পরিণত হয়েছিল। বাঙালির আশা আকাঙ্খার ঠিকানা হয়েছিল। হয়ে উঠেছিল নিরাপদ আশ্রয়। আবার শত্রুদের চক্ষুশূল। দেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে এই বাড়ি ছাড়েননি বঙ্গবন্ধু। ওঠেননি সরকারি আলিশান বাসভবনে। স্বাধীনতার আগে পরে আওয়ামী লীগের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মিটিংও হয়েছে এই বাড়িতে। যদিও কংগ্রেসের অনেক মিটিং নেতাজির বাড়িতে হয়েছে। তবে ৩২ নম্বরের মতো সংগ্রামের সদর দপ্তরে পরিণত হয়নি। পরিণত হয়নি একটি জাতির ঠিকানায়। ৩২ নম্বর একটি জাতির ঠিকানায় পরিণত হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধুর এই বাড়ি নিয়ে এক ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন কথাসাহিত্যিক শামস সাইদ। উপন্যাসটির নাম দিয়েছেন ‘ধানমন্ডি ৩২ নম্বর’। এই উপন্যাস নিয়ে কথা হয়েছিল লেখকের সংগে। একটি বাড়ি নিয়ে একটা উপন্যাস লেখা যায় হঠাৎ করে এই বিষয়টা মাথায় এলো কি করে আপনার।

সত্যি বলতে এই বাড়ি নিয়ে উপন্যাস লেখার কোন পরিকল্পনা ছিল না আমার। আবার হঠাৎ করেও লেখা শুরু করিনি। আজ থেকে বারো বছর আগে আমি গিয়েছিলাম ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে। সেটাই ছিল আমার প্রথম যাওয়া। বাড়ির ভেতরও ঢুকেছিলাম। ঘুরে দেখেছিলাম একরুম থেকে অন্যরুম। বাড়িটা তখন জাদুঘর। এই বাড়িতে প্রতিদিন অনেক মানুষ আসেন। সেদিনইও অনেক মানুষ দেখেছিলাম। তবে কারো মুখে আমি হাসি দেখিনি। একজনকে খুব কাঁদতে দেখেছিলাম সেদিন। কেন কাঁদছেন জানি না। আমারও খুব কষ্ট হচ্ছিল। অনেক কষ্ট জমা হয়েছিল বুকে। সেটা এই ভেবে যে বাড়ির সব কিছু আছে। হয় তো তেমনি সাজানো নেই। এলোমেলো স্মৃতিতে ভরপুর বাড়িটা। শুধু সেই স্বপ্নের মানুষরা নেই। এক সকালে মেরে ফেলল তাদের সবাইকে। কেন? কী অপরাধ ছিল তাদের? এমন একটা প্রশ্ন তখনই আমার মাথায় এসেছিল। তার উত্তর আজও আমি পাইনি। তখনই মূলত কষ্টটা হচ্ছিল। তবে সেসময়ও এই বাড়ি সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না। এতটুকুই জানি এই বাড়িটা বঙ্গবন্ধুর। এখানেই থাকতেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের সবাইকেসহ এই বাড়িতে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। এর বাইরে তেমন কিছু জানা ছিল না। তবে সেদিন মনে হয়েছিল বিবিসির সংবাদদাতা ব্রায়ন বারণের কথা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরে সংবাদ বিবরণীতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন,‘শেখ মুজিব সরকারিভাবে বাংলাদেশের ইতিহাস এবং জনগণের হৃদয়ে উচ্চতম আসনে প্রতিষ্ঠিত হবেন। যখন এঘটনা ঘটবে তখন নিঃসন্দেহে তার বুলেটবিক্ষত বাসগৃহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্মারকচিহ্ন এবং কবরস্থান পূণ্যতীর্থে পরিণত হবে।’ সেদিন মনে হয়েছিল ব্রায়নের ভবিষ্যৎ বাণী সত্যি হয়েছে।

এই বাড়ির ইতিহাস আমাকে ভীষণভাবে তাড়িত করেছিল। যতনা সৃষ্টি করেছিল। এরপর এই বাড়িটি নিয়ে লিখতে যাওয়াটা আমার জন্য অত্যাবশক হয়ে পড়েছিল, চাপ মুক্তির জন্য। উপন্যাস লিখতে হলে তো নতুন একটা জার্নি শুরু করতে হবে। নতুন করে পড়াশোনা করতে হবে। শুরু করলাম পড়াশোনা। তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করেছি। চারবছর পড়াশোনা করার পরে মনে হলো এখন আমি উপন্যাস লেখায় হাত দিতে পারি। তবে প্রতিনিয়তই আমাকে অবাক করেছে এই বাড়ির ইতিহাস। তখন আমার মনে হলো এই বাড়িটা খুবই সাধারণ বাড়ি। যে বাড়িতে একটা শিতাতপ যন্ত্র পর্যন্ত নেই। আলিশান কোনো বাড়ি নয়। মধ্যবিত্ত কোন এক বাঙালি পরিবারে বাড়ির বাইরে কিছু ভাবা যায় না।

আবার এই বাড়িতেই স্বপরিবারে নিহত হয়েছেন বঙ্গবন্ধু। বেশ সমৃদ্ধ ইতিহাস এই বাড়ির। ভাবলাম একটা বড় উপন্যাসই লিখব। হয়ত পাঁচশ পৃষ্ঠা হবে। বেশ একটা উত্তেজনা কাজ করছিল আমার ভেতর তখন। এরকমই হয়তো হয়। বড় কোন কাজ করতে গেলে আলাদা একটা উত্তেজনা থাকে।

লিখতে বসে তিনমাসের কিছু বেশি সময় এই উপন্যাস আষ্টেপৃষ্ঠে বেধে রেখেছিল আমাকে। দূরে সরিয়ে রেখেছিল পৃথিবীর সব ভাবনা থেকে। ডুবে গেছিলাম একটা ইতিহাসের পুকুরে। প্রতিটা শব্দই তুলে আনতে হয়েছে সেখান থেকে। আবার ছুটতে হয়েছে কারো কাছে। এভাবেই চলছে লেখা। এক সময় দেখলাম ইতিহাসের পুকুর থেকে নদীতে নেমে পড়েছি। মানে বাড়ছে কল্পনার পরিধি। পাঁচশ পৃষ্ঠায় আটকানো সম্ভব হচ্ছে না উপন্যাস। এবার যেন ইতিহাসের সমুদ্রে সাঁতার কাটছি। কল্পনা বাড়ছে বাড়ছে, কোথায় যাচ্ছে জানি না। হারিয়ে ফেলেছি শব্দের নিয়ন্ত্রণ। তখন ভাবলাম উপন্যাসটা দুইখ- করব। কিন্তু কয়েকদিন পরে দেখলাম তাতেও আটকাতে পারছি না। পাঁচশ, আটশ ছাড়িয়ে কল্পনা যেখানে গিয়ে তার রথ দাঁড় করাল সেখানে গিয়ে দেখি চার হাজারের বেশি পৃষ্ঠা। তখন আর শব্দে বা পৃষ্ঠায় নয়, সময় হিসেবে এই উপন্যাসকে খ-িত করলাম। তাতে ছয় খ- হলো।

হ্যাঁ বলা যায় এই উপন্যাসটি বিশাল। যেকোন উপন্যাস লেখতেই প্রথমে যেটা লাগে সে হচ্ছে প্রবল ধৈর্য ও সময়। তবে ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে আরো একটা ঝামেলায় পড়তে হয় সে বেশ লেখাপড়া করতে হয়। নোট নিতে হয়। প্রথম খ- শেষ করলাম রমজানের ঈদের তিনদিন আগে। শব্দ সংখ্যা দাঁড়াল দুই লক্ষ্য সতের হাজার। এডিট করলে আরো কয়েক হাজার হয়ত বাড়বে। শেষ করে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। মনে বেশ উত্তেজনাও রয়েছে। কি যেন একটা করে ফেলেছি। একটা ভালো লাগাও কাজ করছে। একদিন পরে বসলাম এডিট করতে। কয়েকমিনিট পরে কম্পিউটার কিছু একটা সংকেত দিয়ে মনিটর নীল হয়ে গেল। হারিয়ে গেল আমার দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল ২ লক্ষ্য ১৭ হাজার শব্দসহ আরো অনেক কিছু।

একদিন দেখলাম উপন্যাসটা তার গন্তব্য স্পর্শ করেছে। এবার ২ লক্ষ ৪৭ হাজার শব্দে গিয়ে শেষ হয়েছে। আমি নিজেও বিশ^াস করতে পারছিলাম না কীভাবে লেখাটা শেষ হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম অনেক খানি ভালোবাসা আর প্রবল মনোবল ছাড়া এই শব্দগুলোকে এক করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

তাতে মনে হচ্ছে উপন্যাস লিখতে আপনি খুব বেশি সময় নেননি। না সে হিসেবে সময় খুব একটা বেশি লাগেনি। আমি উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি অনেক সময় নিই। তবে আমার লিখতে খুব সময় লাগে না। কেননা আমি কাজই করি শুধু লেখালেখি। তাই আমি দ্রুত একটা লেখা শেষ করতে পারি। আমরা জানি এই বাড়িটার অনেক ইতিহাস আছে। তবে একটা বাড়ি নিয়ে এত বড় উপন্যাস লেখার কি আছে।

এমন প্রশ্ন অনেকেরই ছিল। তবে আমি বঙ্গবন্ধু কিংবা তার পরিবারের কাহিনি লিখিনি। কোন রচনাও লিখিনি। একটি বাড়ির গল্প লিখেছি। একটা বাড়ির কিছু খ- খ- মুহূর্ত তুলে ধরেছি। যাতে উঠে এসেছে একটি পারিবারের কথা, একটি জাতির কথা, একটি দেশের কথা, একজন নেতার কথা, একটি নতুন ইতিহাস সৃষ্টির কথা, একটি জাতির স্বপ্ন, আশা আকাক্সক্ষা, আশ্রয়, সংগ্রাম, স্বাধীনতা আবার একটি রাতের কাহিনি। সব হারিয়ে শূণ্য এই বাড়িতে ফিরে আসা এক বঙ্গকন্যার কথা। আবার একটি জাদুঘরের কথা। তাতে যতটুকু তুলে ধরা দরকার এর বাইরে বাহুল্য তেমন কিছু লিখি নাই। আমার বিশ্বাস এই উপন্যাস  একটি নতুন ইতিহাস জন্ম দিবে।

উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে অন্বেষা প্রকাশন।
মূল্য ৬০০ টাকা। প্যভিলিয়িন ২২। র্ফমা ৪০, পৃষ্ঠা ৬৪০


বাংলাদেশ সময়: ১১:০৫:৪৩ এএম | ৩৯ বার পঠিত


পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

পুরনো খবর দেখতে:



---

আরো পড়ুন...