‘শিশুর কোলে শিশু’ পিতা কে?
হোমপেজ » মুক্তমত » ‘শিশুর কোলে শিশু’ পিতা কে?


রবিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০১৮

এই ছবিটি প্রতীকী

কাজী সাঈদ
গত ২৫ জানুয়ারি ফজরের আজানের পূর্ব মুহূর্তে জন্ম নেয় শিশুটি। পৃথিবীর অন্যসব শিশুর মতো সে জন্ম নেয় নি। তার জন্ম অনেকটা আলাদা। অন্ধকার রাতে জন্ম নেওয়া শিশুটির ভবিষ্যৎ আরও বেশি অন্ধকারে। জন্মের কয়েক ঘন্টা পরে শীতের সকালের কুয়াশার বুক চিড়ে সূর্য উঁকি দেয়। পৃথিবী আলোকিত হয়। শিশুটির জন্ম নেওয়ার সংবাদটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে যায় দূর-দূরান্তে। পাল্লা দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে বাংলা অভিধানের ছিঃ ছিঃ ছিঃ শব্দটিও। জন্মের পর পরই সে শুনতে পায় তার বাবা কে? তার বাবার সন্ধান ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু তিন দিনেও বাবার সন্ধান মেলেনি। বাবার সন্ধান মেলবে কি না এমন প্রশ্ন সকলের মুখে মুখে। সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া শিশুটিকে কেন শুনতে হলো এসব কথা? এর দায় কে নিবে? পটুয়াখালী জেলার মহিপুর থানার লতাচাপলী ইউনিয়নের দিয়ারআমখোলা গ্রামের ঘটনা এটি।

আমার কানে সংবাদটি আসতে খুব বেশি দেরি হয় নি। সকাল দশটার দিকে খবর পেলাম। দেখতে যাবো কী যাবো না চিন্তায় পরলাম। শেষ পর্যন্ত ওইদিন আর গেলাম না। কিন্তু পরের দিন না গিয়ে পারলাম না। গিয়ে দেখি ছোট্ট একটি দোচালা টিনের ঘর। ঘরের পিছনে কয়েকজন মহিলা বসে আছেন। আমাকে বাড়িতে ঢুকতে দেখে আশেপাশের কয়েকজন জড়ো হলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য উপস্থিত হলেন। তার একটু পরে গ্রাম পুলিশ ও কয়েকজন মুরব্বি গেলেন। ঘরে উঠে সামনের বারান্দায় বসে শিশুটির নানির সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। তিনি কথা বলা শুরু করেই হাউমাউ করে কেঁদে দিলেন। লোকজন বেশি হওয়ার তার সাথে আর কথা বলা সম্ভব হলো না। পিছনের বারান্দায় চলে গেলাম। খড়কুটার ওপরে ওগলা বিছানো বিছানা। একটি শিশু কোলে নিয়ে শুয়ে আছে আর একটি কন্যাশিশু। অল্প কথায় বলা যায় ‘শিশু কোলে শিশু’। সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া শিশুটির নামের নাম তানজিলা। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় তার জন্ম তারিখ ১৫ মে, ২০০৭। ২০১৭ সালে সমাপনী পরীক্ষায় পাস করে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে।

তানজিলা মা আছিয়া বেগম জানালেন, তার মেয়ের চলাফেরায়, কাজ-কর্মে, লেখাপড়ায় গর্ভাবস্থার কোন লক্ষণ সে দেখতে পায় নি। বুধবার দুপুরে (সন্তান জন্মের আগের দিন) তানজিলা মইয়্যা জাল নিয়ে পার্শ্ববর্তী খালে মাছ ধরছে। রাত ১০/১১ টার দিকে তানজিলা পেটে ব্যাথার কথা বলে। তিনি অন্য কোন ব্যাথা হতে পারে বলে তানজিলার বিছানায় যায়নি। শেষ রাতের দিকে ব্যাথা বেশি অনুভব হওয়ায় প্রতীবেশি এক মহিলাকে ডেকে আনেন। ওই মহিলাকে ঘরে রেখে তানজিলার বাবার কাছে ফোন করার জন্য অন্য বাড়িতে যান। স্বামীকে মেয়ের পেট ব্যাথার কথা বলে ফিরে এসে দেখেন একটি পুত্র সন্তান জন্ম নিয়েছে। তিনি আরও বললেন, আমি বার বার মেয়ের কাছে জিজ্ঞাসা করেছি, মেয়ে একমাত্র হযরত আলীর কথাই বলে। তিনি তার মেয়ে এবং শিশুপুত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

শিশুকন্যা তানজিলার ভাষ্য, একদিন স্কুল থেকে ফিরে তার মাকে ঘরে না পেয়ে হযরত আলীর বাড়িতে খুঁজতে যায়। এসময় ওই বাড়িতে কেউ না থাকায় হযরত আলী জোরপূর্বক তার সাথে মেলামেশা করে। বিষয়টি লজ্জায় সে গোপন রাখে। এতদিনেও তানজিলা নাকি তার গর্ভের বিষয়টি টের পায়নি! এখন তানজিলার দাবী তার শিশুপুত্রের পিতার পরিচয় নিশ্চিত করা। কিন্তু তানজিলা যার কথা বলছেন সে তোর স্বীকার করছেন না। হযরত আলী বর্তমান রাজধানীতে আছেন। আমি মোবাইলে তার সাথেও কথা বলছি। তার দাবি ষড়যন্ত করে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে। হযরত আলী উল্টো তার চাচা ফজলুল হকের (তানজিলার স্কুল শিক্ষিক) বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। হযরত আলীর অভিযোগ ফজলুল হক মাষ্টার মোটা অংকের টাকা বিনিময়ে তানজিলা ও তার পরিবারের মুখ বন্ধ করে তাকে ফাঁসানো চেষ্টা করছেন। কারণ হিসেবে সে উল্লেখ্য করেন তার চাচার সাথে তাদের দীর্ঘদিনের জমিজমা নিয়ে বিরোধ চলছে। অবশ্য স্থানীয়রাও চাচা ফজলুল হককেই সন্দেহ করছেন। যে ই হউক, শিশুটির দায়িত্ব কে নেবে? স্থানীয়রা চাচা-ভাতিজার মধ্যেই সন্দেহের বীজ বপন করেছেন।

স্থানীয়দের বিশ্লেষণ এভাবে, ভাতিজা হযরত আলী যদি নির্দোষ হয়, তাহলে চাচা দোষী। আর চাচা নির্দোষ হলে, ভাতিজা দোষী। যদি চাচা-ভাতিজা দুইজনই নির্দোষ হয়, তাহলে একে অপরকে দোষী করার চেষ্টা করবেন কেন? আবার তানজিলার বাড়ির আশেপাশে আরও কয়েক বাড়ি আছে, পোলাপানও আছে। অপেক্ষাকৃত দূরের প্রতিবেশীদের কথা বলবে কেন?
তানজিলার বড়বোন মরিয়ম বেগম বললেন, বৃহস্পতিবার খুব ভোরে হযরত আলীর বড় বোন আসমা এসে বিষয়টি গোপন রাখার জন্য অনুরোধ করেন। পরামর্শ দিয়ে বলেন, তানজিলাকে কয়েকদিন পিছনের বারান্দায় রেখে শিশুটি রাস্তার কোথায় খড়কুটার মধ্যে রেখে আসতে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে শিশু কোন পাগলের। এদিকে ফজলুল হক মাষ্টারও কম বেশি টাকা খরচ করেছেন। মান সম্মানের ভয়ে হউক আর চাকরী হারানো ভয়ে হউক। তিনি আতংকিত।

তানজিলা এখন কিভাবে প্রমাণ করবেন শিশুটির পিতা কে? সে যার বলে দাবি করে আসছে, তাকে কিভাবে স্বীকার করাবে? দেশে যেসকল পরীক্ষা-নীরিক্ষার পদ্ধতি আছে তা কে করবে? তানজিলার পরিবারের কি সে সামার্থ আছে? অসহায় পরিবারটির পাশে কে দাঁড়াবে? আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবে? তানজিলা হয়তো অসহায়ত্বে কাছে পরাজিত হয়ে মেনে নিবে। মেনে নিবে তার পরিবারও। কিন্তু শিশুটি বাবা বলে কাকে ডাকবে? সত্যিকার অর্থে যিনি জন্মদাতা তিনি যদি নিজ ইচ্ছায় দায়িত্ব না নেয়, তাহলে কিছুই করার থাকবে না এই পরিবারটির। জন্মদাতা পিতার হৃদয় যদি নাড়া দেয়, তাহলে শিশুটি পাবে তার পিতাকে। পিতা এসে তার সন্তানকে কোলে নিবে, এই বিশ্বাস রাখতেই হচ্ছে। # # #

লেখক : বার্তা সম্পাদক, অনলাইন সাগরকন্যা।


বাংলাদেশ সময়: ০৫:০২:০৭ পিএম | ৫০১ বার পঠিত


পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

পুরনো খবর দেখতে:



---

আরো পড়ুন...