জলবায়ূ পরিবর্তন ও
বনদস্যূদের ছোবলে ধ্বংস হচ্ছে টেংরাগিরি বনাঞ্চল
হোমপেজ » পরিবেশ-জীববৈচিত্র » বনদস্যূদের ছোবলে ধ্বংস হচ্ছে টেংরাগিরি বনাঞ্চল


বুধবার, ২৪ জানুয়ারি ২০১৮

ক্রমান্বয়ে ধ্বংস হতে চলা টেংরাগিরি বানাঞ্চল

আমতলী সাগরকন্যা প্রতিনিধি ॥
জলবায়ূ পরিবর্তন ও বনদস্যুদের ছোবলে ধ্বংস হচ্ছে টেংরাগিরি বনাঞ্চল। এতে হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। ভারসাম্য হারাচ্ছে পরিবেশ। বিপন্ন হচ্ছে প্রাণীকুল। সাগরের প্রচন্ড ঢেউয়ের তোড়ে তীর ভেঙ্গে সাগরে বিলিন হচ্ছে বনাঞ্চল। শ্বাসমূলীয় গাছগুলোতে পলি জমে ও প্রচন্ড ঢেউয়ে গোড়ার মাটি-বালু সরে এই বনাঞ্চলের গাছ মরে যাচ্ছে।
বনবিভাগ সুত্রে জানা গেছে, বরগুনার তালতলী উপকূলীয় সংরক্ষিত বনাঞ্চল নিদ্রাসকিনা, নিশানবাড়িয়া ও নলবুনিয়ার নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দয্যের লীলাভুমি টেংরাগিরি। টেংরাগিরি বন্যপ্রাণ অভয়ারন্য বা ফাতরান বন (Tengragiri wildlife sanctuary)। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা টেংরাগিরি ১৯২৭ সালের পূর্বে সুন্দরবনের অংশ ছিল।
১৯২৭ সালের বন আইন অনুযায়ী, ১৯৬০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার এটিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করে। পরে ১৯৬৭ সালে এটিকে টেংরাগিরি বনাঞ্চল হিসেবে নামকরণ করা হয়। ২০১০ সালের ২৪ অক্টোবর ৪০৪৮.৫৮ হেক্টর জমি নিয়ে গঠিত হয় টেংরাগিরি বন্যপ্রাণী অভয়ারন্য। বঙ্গোপসাগরে কোল ঘেষা এ বনাঞ্চলের তিন দিকে সাগর ও বান্দ্রা খাল, মেরজেআলীর খাল, সিলভারতলীর খাল, ফেচুয়ার খাল, গৌয়মতলার খাল, কেন্দুয়ার খাল, সুদিরের খাল, বগীর দোন খাল ও চরের খাল এ নয়টি ক্যালেন (খাল) বেষ্টিত এ বনাঞ্চল। প্রাকৃতিক সৌন্দের্য্যরে অপরূপ লীলাভুমি এ বনাঞ্চলের সাগর প্রান্তে দাড়িয়ে সূর্যোদ্বয় ও সূর্য্যাস্তের অপরূপ ও মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়। সাগরপাড়ে সবুজের সমারোহ, বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও পাখির কলতান মুখরিত বনাঞ্চল। নানান সুরেলা কণ্ঠে এখানে উপভোগ করা যায় পাখপাখালির মিষ্টি কলকাকলি। গভীর অরণ্যের বুকচিরে এসব নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে দেখতে চোখে পড়বে সাগরের বিশালতা। বিভিন্ন গাছপালা সমৃদ্ধ কেওড়া, গরাণ,গেওড়া,ওডা,জাম, ধুন্দল, সুন্দরী, বাইন, করমচা, বলই, তাল, কাঁকড়া, বনকাঁঠাল, রেইনট্রি, হেতাল ও তাম্বুলকাটা প্রভুতি শ্বাসমূলীয় গাছ হচ্ছে এ বনের প্রধান প্রাণ। সুন্দরবনের পর এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বন। এই সংরক্ষিত বনে রয়েছে হাজার প্রজাতির প্রাণীকুলের মধ্যে কাঠবিড়ালি, বানর, শজারু, শূকর, কচ্ছপ, শিয়াল, ডোরাকাটা বাঘ, বনমোরগ, মধু কাঁকড়া, বন্যগরু, মহিষ ও প্রায় ৪০ প্রজাতির সাপ।জলবায়ূ পরিবর্তন ও বনদস্যুদের ছোবলে পড়ে ধীরে ধীরে উজাড় হচ্ছে টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। বনদস্যুরা বনরক্ষিদের সাথে যোগসাজসে গহীন বনের সতেজ গাছ কেটে নিচ্ছে যাচ্ছে। জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় শ্বাসমূলে বালু জমে ও প্রচন্ড ঢেউয়ে গাছের গোড়ার মাটি-বালু সরে গিয়ে গাছ মরে যাচ্ছে।
বুধবার সরেজমিনে ঘুরে দেখাগেছে, টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নলবুনিয়া, নিশানবাড়িয়া, আশারচর ও নিদ্রা-সখিনা এলাকায় দূর থেকে দেখতে অপরূপ ঘন বন মনে হলেও বনদস্যূদের ছোবলে ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেছে। সাগর সংলগ্ন কয়েক কিলোমিটার এলাকার বনের গাছ স¤পূর্ণ উজাড় হয়ে গেছে। অসংখ্য গাছের বাকল ও ডালপালা ছেঁটে ফেলায় সে সকল গাছ মরে যাচ্ছে। নিদ্রা ও আশারচর এলাকায় কয়েক হাজার গাছ কেটে সাবাড় করার পর পড়ে আছে সে সব গাছের গোড়া। টেংরাগিরি বনাঞ্চলের দক্ষিণ সাগর সংলগ্ন চরে অসংখ্য বড় বড় রেইনট্রি, কেওড়া ও ছৈলা গাছ মরে পড়ে আছে। সাগরের প্রচন্ড ঢেউয়ের  তোড়ে অসংখ্য গাছের গোড়ার মাটি সরে গিয়ে শিকড়-বাকড় বের হয়ে গেছে। বালুতে এসব গাছের শ্বাসমূল ঢাকা পরায় প্রয়োজনীয় অক্সিজেন গ্রহন করতে পারছে না।  ফলে গাছগুলোর পাতা ও কান্ড মরে যাচ্ছে। জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির পেয়ে বনাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় ভূমির দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে। জলবায়ূ পরিবর্তনের কারনে লবনাক্ততা বৃদ্ধি পেয়ে ও গাছের গোড়ায় বালু জমে গাছগুলো মারা যাচ্ছে। ভাঙ্গনের কবলে পড়ে অনেক গাছ সাগরে বিলিন হয়ে যাচ্ছে।
জেলে নিজামুর রহমান, শহীদ, আবদুল রাজ্জাক, জলিল হাওলাদার, শাহ আলম ও সোহেল জানান, নিদ্রা, সখিনা, আশারচর, নলবুনিয়া বনসংলগ্ন গ্রামগুলোতে ২০-২৫ গ্রুপের সক্রিয় বনদস্যু ও চোর চক্র রয়েছে। এরা বনরক্ষীদের সাথে যোগসাজসে গহীন বনের বড় বড় গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। তারা আরো জানান, চার-পাঁচ বছর আগেও জোয়ারের পানি সাগরের কাছাকাছি থাকত। এখন তা সমগ্র বনাঞ্চলে ঢুকে পড়ছে। এতে বনের গাছের গোড়ার মাটি ক্ষয় হয়ে গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে । তারা আরো জানান, ঘূর্ণিঝড় সিডরে অসংখ্য গাছ মরে গেছে। তারপর আর গাছ রোপন করা হয়নি। বনভূমি রক্ষায় শিগগিরই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবী জানান তারা। পর্যটক আহারুজ্জামান আলমাস খান, নজরুল ইসলাম ও সুমি বেগম জানান, প্রচন্ড ঢেউয়ের চাপে সাগরের তীর ভেঙ্গে বনাঞ্চল সাগরে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত এ বনাঞ্চল রক্ষায় সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
সখিনা বিটের বিট কর্মকর্তা জাহিদ প্রামনিক বলেন, টেংরাগিরি বনের গাছ মরে যাওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। সাগরের প্রচন্ড ঢেউয়ের কারনে পাড় ভেঙ্গে বনাঞ্চলের অনেক গাছ সাগরে বিলিন হয়ে গেছে। সাগর ভেঙ্গে বনাঞ্চল অনেক ছোট হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত জোয়ারে গাছের গোড়ায় বালু জমে গাছ মারা যাচ্ছে। তবে তিনি বনদস্যুরা বন থেকে গাছ কেটে সাবাড় করে দিচ্ছে এ বিষয়টি অস্বীকার বলেন,কাঠ চুরির সঙ্গে বন বিভাগের কমকর্তা-কর্মচারীদের কোন যোগসাজস নেই।
টেংরাগিরি বানাঞ্চলের সাগর তীরবর্তি পর্যটকদের জন্য তৈরী করা গোলাঘর বিলীন হতে চলেছে

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোফরেস্ট্রি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোঃ আলমগীর কবির  বলেন, জলবায়ূ পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বেড়ে  গ্রাষ্ম ও বর্ষাাকালে অনিয়মিত বর্ষণ ও অতিবর্ষণ হচ্ছে। যার ফলে নদী সমুহের অববাহিকায় অধিকমাত্রায় ভূমি ক্ষয় হচ্ছে। এতে নদীর পাড়  এবং নদীর তলদেশে ক্ষয় ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে সাগর মোহনায় অধিকমাত্রায় পলি জমা হচ্ছে। যা ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের উদ্ভিদের জীবন চক্রের স্বাভাবিক পর্যায়াবর্তনকে (সাকসেশন) সংক্ষিপ্ত ও দ্রুত করছে। ফলশ্রুতিতে টেংরাগিরির মত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে কেওড়া, ছৈলা, বাইন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের বাগানের জীবন চক্র পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই একযোগে মরে যাচ্ছে। পানিবাহিত পলি জমে শ্বাসমূল ঢেকে যাওয়ার কারনেই মুলতঃ এ ঘটনা ঘটছে।
পটুয়াখালী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) অজিত কুমার রুদ্র বলেন, জলবায়ূ পরিবর্তনের কারনে সাগরের তলদেশ ভরাট হয়ে জোয়ারের পানির উচ্চতা বেড়ে গেছে। ফলে সাগর সংলগ্ন বনাঞ্চল ক্রমান্বয়ে নদী গর্ভে বিলিন হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, শ্বাসমূলীয় বনের গঠনে তিনটি স্তর আছে। প্রথমত উপকূলে ভূমি গঠনের পর উড়িগাছ জন্মায়। দ্বিতীয়ত মাটি কিছুটা শক্ত হলে উড়িগাছ মরে গিয়ে কেওড়া, বাইন, গেওয়া ও ছইলা গাছ জন্মায়। তৃতীয়ত মাটি আরও শক্ত হলে আগের গাছগুলো মরে গিয়ে ওইখানে সুন্দরী, গড়াণ, পশুর ও কাকড়াসহ অন্যান্য গাছ জন্মায়। শ্বাসমূলীয় গাছগুলো অভিযোজন পদ্ধতিতে শ্বাস প্রশ্বাস গ্রহন করে। জোয়ারের পানিতে লবনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার গাছ মরে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, শ্বাসমূলীয় গাছ ও টেংরাগিরি বনাঞ্চল রক্ষায় বিভিন্ন প্রজাতির ম্যানগ্রোভ গাছ লাগানো ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা  পরিকল্পনা টিম কাজ করছে। বনরক্ষিদের যোগসাজশে বনাঞ্চলের গাছ কেটে নেয়ার কথা অস্বীকার করে আরো বলেন, সাগর পাড়ের কিছু গাছ জেলেরা চুরি করে কেটে নিয়ে যাচ্ছে।

এমএইচএকে/এনইউবি


বাংলাদেশ সময়: ০৬:৩৮:০৪ পিএম | ১৪২ বার পঠিত


পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

পুরনো খবর দেখতে:



---

আরো পড়ুন...